চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও এক বছর না পেরোতেই ফের অনিশ্চয়তায় পড়েছে এর ভবিষ্যৎ। বর্তমান রাকসু কমিটির এক বছরের মেয়াদ শেষ হলেও পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো প্রস্তুতি নেই। ফলে কবে নাগাদ নতুন নির্বাচন হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের জুলাইয়ে রাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। প্রথমে সেপ্টেম্বরে ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হলেও কয়েক দফা পরিবর্তনের পর ১৬ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ তিন যুগ পর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত প্যানেল ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নির্বাচনের আগে ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’-এর ২৪ দফা ইশতেহারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল রাকসু নির্বাচনকে ক্যালেন্ডারভুক্ত করা। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রায় এক বছর পর বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
রাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, নির্বাচিত নির্বাহী কমিটির মেয়াদ দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে এক বছর। তবে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও নতুন নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান।
তিনি বলেন, ‘নতুন নির্বাচন নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে উপাচার্যের ওপর। তিনি যখন মনে করবেন, তখনই নির্বাচন হবে। আমার কাছে যেসব তথ্য বা ফাইল চাওয়া হয়েছিল, আমি সব প্রস্তুত করে দিয়ে দিয়েছি।’
নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পর্কে অধ্যাপক সেতাউর রহমান বলেন, ‘উপাচার্য আমাকে আগের নির্বাচনের অবস্থা, কারা দায়িত্বে ছিলেন এবং কী কী সমস্যা ছিল সেসব তথ্যসহ একটি ফাইল দিতে বলেছিলেন। আমি সে অনুযায়ী তাঁকে ফাইল দিয়েছি। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে, শিক্ষার্থীরা নির্বাচন আয়োজনের জন্য চাপ দিচ্ছেন। সেই প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আলোচনার মধ্যে রাখার অংশ হিসেবে হয়তো এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নির্বাচন আয়োজনের জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়া প্রয়োজন, তার কিছুই এখনো দৃশ্যমান নয়।’
তবে রাকসুর বর্তমান নেতৃত্বের দাবি, নির্বাচন আয়োজনের জন্য তারা প্রশাসনের কাছে নিয়মিত দাবি জানিয়ে আসছেন।
রাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘রাকসু নির্বাচন আয়োজনের জন্য আমাদের জায়গা থেকে আমরা বারবার দাবি জানিয়ে আসছি এবং প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছি। তবে আমাদের মনে হচ্ছে, প্রশাসন দলীয় সরকারের গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষায় রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রশাসন অন্যান্য বিষয়ে মনোযোগ দিলেও রাকসু নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচনের তিন মাস আগে প্রস্তুতি শুরু করার কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রস্তুতি নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা জানায় ছাত্ররা চাইলে নির্বাচন হবে। কিন্তু ছাত্ররা যে নির্বাচন চায়, সেটি তো গত নির্বাচনেই স্পষ্ট হয়েছে। আমাদের আশঙ্কা, এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে প্রশাসন নির্বাচন না দেওয়ার পথ তৈরি করছে।’
রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘রাকসু আদায় করে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। আমার ইশতেহারেও রাকসু সচল রাখার প্রতিশ্রুতি ছিল। সেই প্রতিশ্রুতি আমি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’
রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির বলেন, ‘পরবর্তী রাকসু যাতে ধারাবাহিকভাবে চালু থাকে, সেটি আমাদের ইশতেহারের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল। এ লক্ষ্যে তৃতীয় অধিবেশন থেকেই উপাচার্য স্যারকে বিষয়টি জানিয়ে আসছি। সর্বশেষ গত মাসের ৩০ তারিখ অনুষ্ঠিত অধিবেশনে উপাচার্য বর্তমান কোষাধ্যক্ষকে নির্বাচনের তফসিল প্রণয়ন ও গঠনতন্ত্র সংস্কারের দায়িত্ব দিয়েছেন। এ দুটি বিষয়ে দ্রুত তাঁকে হালনাগাদ তথ্য জানাতে নির্দেশ দিয়েছেন।কোষাধ্যক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর পরবর্তী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তফসিল ও গঠনতন্ত্র সংস্কারের বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া হবে। আমরা কোষাধ্যক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। আশা করছি, শিগগিরই এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য জানাতে পারব।’
পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন রাকসুর সভাপতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশাবাদী, পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করব। রাকসুর ব্যাপারে আমরা ইতিবাচক। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা চাই, রাকসু কার্যকর থাকুক। শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা কাজ করলে প্রশাসনের জন্যও সুবিধা হবে।’
উপাচার্য বলেন, ‘সামনে আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। এর মধ্যে ভর্তি পরীক্ষা অন্যতম। ভর্তি পরীক্ষার আগে রাকসুর মতো বড় একটি আয়োজন করা আমাদের জন্য বেশ কঠিন হবে। আর মাত্র দুই মাস সময় রয়েছে। ভর্তি পরীক্ষার কাজ শেষ হলে এ বিষয়ে সবাইকে নিয়ে ভাবার সুযোগ হবে।’
রাকসুর মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে উপাচার্য বলেন ‘রাকসুর সংবিধানে ডাকসুর মতো মেয়াদ তিন মাস বাড়ানোর কোনো বিধান আমরা দেখিনি। আনুষ্ঠানিকভাবে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হলে কীভাবে তা বাড়ানো সম্ভব, সেটিও বিবেচনার বিষয়।’
রাকসুর নির্বাচন ও কার্যক্রম ধারাবাহিক রাখার দাবি জানিয়েছেন ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারাও।
রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মেহেদী সজীব বলেন, ‘রাকসু ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চা অক্ষুণ্ণ রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। শিক্ষার্থীদের লিগ্যাল প্ল্যাটফর্ম বলা যায়। প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যে সেতুবন্ধন, সেটির জন্যও রাকসু গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে চাই, রাকসু নির্বাচন অব্যাহত থাকুক।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাকসুর মেয়াদ শেষ হয়েছে। তাই অনতিবিলম্বে পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা উচিত। প্রশাসন পরিবেশ-পরিস্থিতির কথা বলছে। কিন্তু ক্যাম্পাসে এমন কোনো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি, যার কারণে রাকসু নির্বাচন দিলে পরিবেশ ঘোলাটে হবে। আমরা স্মারকলিপির মাধ্যমে আবারও দ্রুত তফসিল ঘোষণার দাবি জানাব।’
শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল মিঠু বলেন, ‘স্বাধীন মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি নির্বাচন তথা ছাত্র সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে রাজনৈতিক সহাবস্থান জরুরি। সহাবস্থান ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বরের অপর নাম ছাত্র সংসদ নির্বাচন। এটি শুধু ছাত্রদল নয়, প্রতিটি সংগঠনের কাছেই জনপ্রিয় দাবি। আমরা বরাবরই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী। রাকসুর এই ধারা অব্যাহত থাকুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘এবারের রাকসু প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাকসুর প্রয়োজন রয়েছে। আগামীতে শিক্ষার্থীরা সচেতনভাবে প্রতিনিধি নির্বাচন করলে রাকসুর মাধ্যমে ভালো কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরাও রাকসু চাই। তাই শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান, আপনারা রাকসুর দাবিতে সোচ্চার হোন।’
প্রসঙ্গত, দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনের পর এক বছর পূর্ণ হলেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল কবে ঘোষণা হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি।
