প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে বাড়ছে পর্যটকদের আনাগোনা, গড়ে উঠেছে ছোট-বড় দেড় শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ। কিন্তু পর্যটন অবকাঠামোর বিস্তার ঘটলেও অগ্নিনিরাপত্তায় রয়ে গেছে বড় ধরনের ঘাটতি। দ্বীপে নেই ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, নেই অগ্নিনির্বাপণে নিয়োজিত প্রশিক্ষিত কর্মী। কোনো হোটেল, রিসোর্ট কিংবা রেস্তোরাঁয় আগুন লাগলে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থাও নেই। ফলে আগুনের ঘটনা ঘটলে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেকে একটি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে ১০ জনের মৃত্যুর পর সেন্টমার্টিনের হোটেল-রিসোর্টগুলোর
নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এর আগে
দ্বীপের পশ্চিম সৈকতের গলাচিপা এলাকায় আগুনে তিনটি রিসোর্টের ২৬টি কক্ষ পুড়ে যায়। এসব ঘটনার পরও দ্বীপে স্থায়ী অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আগামী ১ নভেম্বর থেকে সেন্টমার্টিনে শুরু হচ্ছে পর্যটন মৌসুম, যা চলবে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত। এ সময় প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন। পর্যটকের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হোটেল-রিসোর্টে অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, শুধু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখার নির্দেশনা যথেষ্ট নয়; সেগুলো সচল আছে কি না, জরুরি বহির্গমন পথ নিরাপদ কিনা এবং আগুন লাগলে পর্যটকদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে কিনা, তা যাচাই করতে হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দ্বীপের অনেক হোটেল-রিসোর্টে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম নেই। কোথাও আগুন লাগলে বাড়িতে ব্যবহৃত পানির পাইপ দিয়ে পানি সংগ্রহ করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন বাসিন্দারা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। কিন্তু আগুন বড় আকার ধারণ করলে সীমিত সরঞ্জাম ও লোকবল দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রবল বাতাসে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
গত ১৭ অক্টোবর উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে ১০ জনের মৃত্যু হয়। স্থানীয়দের মতে, এ ঘটনা পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এনেছে। সেন্টমার্টিনের হোটেল-রিসোর্টগুলোয়ও কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি ভোরে সেন্টমার্টিনের পশ্চিম সৈকতের গলাচিপা এলাকায় অগ্নিকা-ে তিনটি রিসোর্টের ২৬টি কক্ষ পুড়ে যায়। প্রবল বাতাসে এক রিসোর্ট থেকে অন্য রিসোর্টে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা চেষ্টার পর পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
স্থানীয় বাসিন্দা মৌ. মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, দ্বীপে আগেও হোটেল-রিসোর্টে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। তখন ফায়ার সার্ভিসের ব্যবস্থা না থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা পানি সংগ্রহ করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্বীপে ছোট পরিসরে হলেও একটি ফায়ার সার্ভিস ইউনিট স্থাপন করা জরুরি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য খোরশেদ আলম বলেন, সেন্টমার্টিনে ফায়ার সার্ভিস স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এ দ্বীপে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। অন্তত পর্যটন মৌসুমে প্রশিক্ষিত কর্মী ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিয়ে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম বলেন, দ্বীপের রিসোর্টে অগ্নিকা-ের পর ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে কথা হয়েছে। হোটেল ও রিসোর্টগুলোয় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে দ্বীপে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের সম্ভাবনা দেখছেন না তিনি। এ কারণে হোটেল-রিসোর্টগুলোয় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ব্যবস্থা রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখার নির্দেশনা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। প্রতিটি হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁয় পর্যাপ্ত ও কার্যকর অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত সেগুলোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে হবে। নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, রান্নাঘরে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন পথ এবং আগুন লাগলে পর্যটকদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। এ ছাড়া কর্মীদের অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকাজে প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত মহড়ার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের মতে, পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই দ্বীপের সব হোটেল-রিসোর্ট পরিদর্শন করে অগ্নিনিরাপত্তার প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন। যেসব প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি পর্যটন মৌসুমে অস্থায়ী ফায়ার সার্ভিস ইউনিট স্থাপন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত কর্মী মোতায়েন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
এ বিষয়ে টেকনাফ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন কমান্ডার কামরুজ্জামান সুমন বলেন, তিনি সম্প্রতি টেকনাফে যোগ দিয়েছেন। সেন্টমার্টিনে ফায়ার সার্ভিসের কোনো স্টেশন ও প্রশিক্ষিত কর্মী নেই। আগামী ২৯ অক্টোবর তারা দ্বীপটি পরিদর্শনে যাবেন। পরিদর্শনের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারবেন বলে জানান।
