দেশের বিভিন্ন এলাকায় সারের ডিলার নিয়োগে দলীয় প্রভাব, আর্থিক লেনদেন এবং অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংসদ সদস্যরা। এ ছাড়া বৈঠকে সারের আমদানি, মজুদ ও বিতরণ পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। পাশাপাশি ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বৈঠকে সারের বিতরণ, মজুদ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম
এবং সারের অবৈধ মজুদ, বিপণন ও অন্যান্য অনিয়ম সরেজমিন পরিদর্শন করে সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং তা নিরসনে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
জানা গেছে, বৈঠকে এসব অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংসদ সদস্যরা। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি মন্ত্রণালয় বলেছে, অভিযোগ যাচাই করে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বৈঠকে বিশেষ করে লালমনিরহাট, বরগুনা, সাতক্ষীরা, ফরিদপুর, নওগাঁ ও যশোর জেলার ডিলার নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।
বৈঠক শেষে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, সারাদেশে সাড়ে চার হাজারের বেশি সারের ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে। ডিলারশিপের শর্ত অনুযায়ী, ৯০ দিনের মধ্যে কোনো ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ডিলারশিপ পরিবর্তন করা যাবে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে সারের ডিলার নিয়োগের অনিয়মের অভিযোগ তোলেন কমিটির সদস্য বিএনপির এমপি মোস্তাফিজুর রহমান, সাবিরা সুলতানা, জামায়াতের এমপি গোলাম রছুল। তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতের এমপির অভিযোগ, দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ডিলার নিয়োগে স্থানীয় প্রশাসন তাদের মতামত না নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের মতামতেই সব করেছে।
বৈঠকে আলোচনার বিষয়ে সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কেউ কেউ সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ করেছেন। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তারা খতিয়ে দেখবেন।
সংসদ সদস্য গোলাম রছুল বলেন, সার ডিলার নিয়োগে প্রকৃত ও অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের অবজ্ঞা করে দলীয় পরিচয় এবং অর্থের বিনিময়ে অনেককে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে মামলার আসামি, মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তি ও আওয়ামী লীগের লোকজনও ডিলারশিপ পেয়েছেন। যারা আট থেকে বারো বছর ধরে ব্যবসা করছেন এবং সার বিক্রিসহ অন্যান্য ব্যবসায় অভিজ্ঞ, তাদের ডিলারশিপ দেওয়া হলে বিতরণব্যবস্থায় অনিয়ম কমবে। কিন্তু নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় পরিচয় এবং অর্থকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রীর কাছে যোগ্য ব্যবসায়ীদের নাম বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েও সাড়া পাননি বলে দাবি করেন তিনি।
গোলাম রছুল বলেন, ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি। অভিযোগগুলো নিয়ে কমিটির সভাপতির কাছে লিখিত আবেদন করবেন। এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্রও তার কাছে রয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে।
বৈঠকে সার বিতরণে অনিয়ম ও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও তোলা হয় বলে জানা গেছে। নওগাঁসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে যমুনা সেতুর পর চেকপোস্ট বসিয়ে সারের গাড়ি তদারকির প্রস্তাব দিয়েছেন কমিটির এক সদস্য।
এদিকে ডিলার নিয়োগের অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, যেসব এলাকায় ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ এসেছে, সেসব ক্ষেত্রে নিয়োগ স্থগিত রাখার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তিন মাসের মধ্যে অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বাদ দেওয়া হবে।
শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ডিলার নিয়োগে তারা অনেকটা পোস্ট অফিসের কাজ করেছে। মূলত নিয়োগ দিয়েছেন ডিসিরা (জেলা প্রশাসক)। কমিটি বলছে, মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই না করলে, এ দায়িত্বে থাকার দরকার কি ছিল? সরাসরি ডিসিদের দিয়ে দিলেই হতো।
বৈঠকে সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগ ওঠা এলাকাগুলোয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। যেসব ক্ষেত্রে এখনও ডিলারশিপের চুক্তি হয়নি, সেসব ক্ষেত্রে অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত চুক্তি সম্পাদন স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে। আর যেসব ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে চুক্তি হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে লালমনিরহাট, বরগুনা, সাতক্ষীরা, ফরিদপুর, নওগাঁ ও যশোর জেলার ডিলার নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।
বৈঠকে সারের বিতরণ, মজুদ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম এবং সারের অবৈধ মজুদ, বিপণন ও অন্যান্য অনিয়ম সরেজমিন পরিদর্শন করে সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং তা নিরসনে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমানের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে আহ্বায়ক করে রোকন উদ্দীন বাবুল ও সাবিরা সুলতানাকে সদস্য করে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন সেলিমের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য শহিদুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, রোকন উদ্দীন বাবুল, মুজিবুর রহমান চৌধুরী, সাবিরা সুলতানা এবং গোলাম রছুল। সভাপতির আমন্ত্রণে অংশ নেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
