ঘরদোর যতই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হোক না কেন, যেকোনও সময় অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথি হিসেবে ছারপোকার উপদ্রব ঘটতেই পারে।
পোকাটি দেখতে ছোট হলেও, এর তৈরি করা সমস্যা কিন্তু বিশাল। বিশেষ করে ভ্রমণের সময় হোটেল থেকে বা গণপরিবহন (যেমন সিনেমা হল বা ট্রেন-সাবওয়ে) থেকে এই পোকা অজান্তেই কাপড়ে বা লাগেজে চড়ে ঘরে চলে আসে।
আর একবার ঘরে আস্তানা গাড়লে এদের তাড়ানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
জীবনধারা-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘রিয়েল সিম্পল’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে, যুক্তরাষ্ট্রের পোকামাকড় ধ্বংস করার সংস্থা ‘অরকিন’-এর প্রধান কীটতত্ত্ববিদ ফ্রাঙ্ক মিক বলেন, “ছারপোকা সাধারণত ৫ মিলিমিটারের মতো লম্বা এবং ডিম্বাকৃতির হয়ে থাকে। যদিও এটা সরাসরি কোনও মারাত্মক রোগ ছড়ায় না, তবে এদের কামড়ে ত্বকে লালচে চুলকানিযুক্ত চাকা হয়ে যায় এবং মানসিক শান্তি ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়।”
মিকের মতে, “ইদানীং বিশ্বজুড়ে ছারপোকার উপদ্রব আবার বাড়ছে এবং কিছু ছারপোকা প্রচলিত সাধারণ কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে, যে কারণে এদের দমন করা এখন আরও কঠিন।”
ছারপোকা চেনার উপায় ও লুকানোর জায়গা
অনেকেই মনে করেন ছারপোকা খালি চোখে দেখা যায় না, যা ভুল ধারণা। পূর্ণাঙ্গ একটি ছারপোকা আপেলের বীজের সমান হয় এবং এরা খুব দ্রুত হাঁটতে পারে।
বিছানায় ছারপোকা থাকলে চাদর বা তোশকের কোণায় ছোট ছোট কালচে বা মরিচা রংয়ের দাগ দেখা যায়, যা মূলত ছারপোকার মল বা পিষে যাওয়া পোকার রক্ত। এরা মানুষের শরীরের তাপ এবং নিঃশ্বাসের সঙ্গে বের হওয়া কার্বন ডাই অক্সাইড-এ আকৃষ্ট হয়। তাই রাতে মানুষ যখন ঘুমায়, তখন এরা কামড়াতে বের হয়।
দিনের বেলা ছারপোকা সাধারণত ঘরের এই জায়গাগুলোতে লুকিয়ে থাকে:
তোশক, জাজিম বা চেয়ার-সোফার কুশনের সেলাই ও ভাঁজে।
জানালার পর্দার ভাঁজে এবং ড্রয়ারের জোড়ামুখে।
দেয়ালের আলগা হয়ে যাওয়া ওয়ালপেপার বা ছবির ফ্রেমের পেছনে।
বৈদ্যুতিক সকেট, সুইসবোর্ড বা খাটের কাঠের চেরা অংশে।
ছারপোকা তাড়ানোর পন্থা
কীটতত্ত্ববিদ ফ্রাঙ্ক মিক বলেন, “ঘরে ছারপোকার উপদ্রব খুব বেশি হলে শুরুতেই পেশাদার ‘পেস্ট কন্ট্রোল’ সদস্যদের সাহায্য নেওয়া উচিত। কারণ তারা কীটনাশকের পাশাপাশি ড্রাই স্টিম (শুকনো ভাপ), তীব্র তাপ বা ঠাণ্ডা করার বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে এদের ডিমসহ ধ্বংস করে।
তবে প্রাথমিক অবস্থায় ছারপোকা দমনে নিচের ঘরোয়া পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করা যায়।
তীব্র তাপের ব্যবহার: ছারপোকা মারার সহজ ও কার্যকর প্রাকৃতিক অস্ত্র হল তাপ। আক্রান্ত কাপড়ের সমস্ত চাদর, পর্দা ও পোশাক গরম পানিতে ধুয়ে ড্রায়ারের সর্বোচ্চ তাপে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট শুকিয়ে নিতে হবে। বা কড়া রোদে শুকাতে হবে।
স্টিম ক্লিনিং: সোফা বা তোশকের যেখানে পানি দেওয়া যাবে না, সেখানে স্টিম ক্লিনিং বা বাষ্পের ভাপ দিতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, ছারপোকা মরার জন্য সেই বাষ্পের তাপমাত্রা অবশ্যই ১৩০ ডিগ্রি ফারেনহাইট অর্থাৎ ৫৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হতে হবে।
ভ্যাকুয়াম ক্লিনিং: ঘরের প্রতিটি কোণা, খাট ও সোফা ভালো করে ভ্যাকুয়াম করতে হবে। কাজ শেষে ভ্যাকুয়ামের ভেতরের ময়লার ব্যাগটি ঘরের বাইরে ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হবে।
প্লাস্টিক ব্যাগে সিল করা: যে জিনিসগুলো ধোয়া বা গরম করা যাচ্ছে না, সেগুলো একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে বা কন্টেইনারে খুব শক্ত করে বাতাস প্রতিরোধী করে ১ বছরের জন্য আটকে রাখতে হবে। এতে ভেতরের সব পোকা না খেয়ে মারা যাবে।
ভ্রমণের সময় সতর্ক থাকা
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ছারপোকা এবং এদের ডিম ধ্বংস করতে অন্তত ১১৯ থেকে ১২৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৪৮.৩৩ থেকে ৫১.৬৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রয়োজন।
ভ্রমণ থেকে ফিরে ছারপোকা মুক্ত থাকতে নিচের কৌশলগুলো অবলম্বন করা উপকারী।
লাগেজ ওপরে রাখা: হোটেলে গিয়ে লাগেজ কখনও বিছানা বা কার্পেটে রাখা যাবে না। বাথরুমের টাইলস বা উঁচু কাউন্টারের ওপর লাগেজ রাখলে ছারপোকা চড়ার ঝুঁকি কমে।
গাড়ির গরম ব্যবহার করা: রোদ উজ্জ্বল দিনে (যদি তাপমাত্রা ভালো থাকে) লাগেজটি প্লাস্টিক ব্যাগে ভরে বন্ধ গাড়ির ভেতর রোদে কয়েক ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। ‘সিডিসি’-র তথ্যানুসারে, বন্ধ গাড়ির ভেতরের তাপমাত্রা সহজেই প্রায় ৫০.৫৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১২৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট পার হয়ে যায়, যা লাগেজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ছারপোকা ও ডিম নিমেষেই মেরে ফেলে।
ঠান্ডা প্রধান দেশে থাকলে লাগেজটি ৪ দিন শূন্য ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় রাখলেও ছারপোকা মরে যায়।
লাগেজ ঘরের বাইরে রাখা: ভ্রমণ থেকে ফিরে লাগেজ সরাসরি শোবার ঘরে না রেখে গ্যারেজ বা স্টোর রুমে রাখা নিরাপদ।
