ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে এগিয়ে দেলাওয়ার
আগামী ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য ঠাকুরগাঁও-১ (সদর-রুহিয়া-ভূল্লি উপজেলা) আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেশ সরগরম হয়ে উঠছে ঠাকুরগাঁওয়ের ভোটের মাঠ। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি চলছে জোরে সোরে।
রাফিক সরকার, ঠাকুরগাঁও
আগামী ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য ঠাকুরগাঁও-১ (সদর-রুহিয়া-ভূল্লি উপজেলা) আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেশ সরগরম হয়ে উঠছে ঠাকুরগাঁওয়ের ভোটের মাঠ। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি চলছে জোরে সোরে। ফ্যাসিবাদের বাহু থেকে নির্বাচন ব্যবস্থা মুক্ত হওয়ায়, বিগত সংসদ নির্বাচনের চেয়ে আসন্ন উপনির্বাচন হবে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দীতামূলক ও উৎসব মুখোর। ভোটাররা যেমন অপেক্ষায় আছে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে। তেমনিভাবে প্রার্থীরাও ভোটারদের মন জয় করতে ছুটে যাচ্ছেন তাদের দ্বারে দ্বারে। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি, দেখাচ্ছেন নতুন ঠাকুরগাঁও গড়ে তোলার স্বপ্ন। ঠাকুরগাঁওয়ে-১ আসনে নির্বাচনী এ দৌড়ে রয়েছেন বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ কংগ্রেসসহ পাঁচটি রাজনৈতিক দলের পাঁচজন প্রার্থী। এখন পর্যন্ত সকল প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে থাকলেও মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে। ঠাকুরগাঁও সদর, ভূল্লি ও রুহিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও-১ আসন, যার মধ্যে রয়েছে ২২ টি ইউনিয়ন ও ১ টি পৌরসভা। ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন।
দেলাওয়ার হোসেন, জামায়াত: এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকলেও ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার সুযোগও নেই বিএনপির। প্রতিদ্বন্ধী হিসেবে শক্ত অবন্থানে আছেন জামায়াত দেলাওয়ার হোসেন। জামায়াতের তরুণ প্রার্থী প্রার্থী মো: দেলাওয়ার হোসেন যেন রীতিমতো বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সলকে ভোটের মাঠে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেন বর্তমানে রয়েছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য পদে। সেই সাথে পালন করছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারি সেক্রেটারির দায়িত্ব। শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি থাকাকালে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে গ্রেফতার করে। টানা ৫৭ দিন রিমান্ডে রেখে তার ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। যা দেশবাসির হৃদয়ে নাড়া দেয়। তখন থেকেই জীবন্ত শহীদ খ্যাত দেলাওয়ার একজন মজলুম নেতা হিসাবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
আসন্ন উপনির্বাাচনে বিএনপি এককভাবে নির্বাচন করলেও জামায়াত ১১ দলীয় ঐক্যের সমর্থন নিয়ে নির্বাচন করছে এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনে দেলাওয়ার হোসেনকে ১১ দলীয় প্রার্থী হিসাবে মনোনীত করেছে। এরপর থেকেই পাল্টে যেতে থাকে ঠাকুরগাঁওয়ের ভোটের সমীকরণ। প্রথমবারের মতো এ আসনে বিজয় নিশ্চিত করতে একাট্টা হয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন জামায়াতসহ ১১দলের নেতাকর্মী-সমর্থকরা। যে কোন মূল্যে দেলাওয়ার হোসেনকে বিজয়ী করতে তারা যেন বদ্ধপরিকর। মিছিল মিটিং সভা সমাবেশ উঠান বৈঠক পথসভা আর গণসংযোগে দিনরাত একাকার করছেন তারা। শহর গ্রাম, হাট বাজার মাঠে-ঘাটে নিরলস প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন দাঁড়িপাল্লার পক্ষে। পরিশ্রমের ফল হিসাবে সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়াও পাচ্ছেন তারা। এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভোটের ফলাফল অনুকূলে আসবে বলেও দৃঢ বিশ্বাস জামায়াতের নেতাকর্মীদের। বিশেষ করে তরুণ, সংখ্যালঘূ এবং নারী ভোটাররা যেভাবে জামায়াতের দিকে ঝুকছে তাঁতে পাল্টে যেতে পারে অতীতের ভোটের হিসাব নিকাশ।
জামায়াত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন অত্র প্রতিবেদককে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, একটি ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা আমার মূল লক্ষ্য। যেখানে সৃষ্টি করা হবে কর্মসংস্থান। থাকবে না সন্ত্রাস, মাদক, সুদ,ঘুষ, দূর্নীতি, চাঁদাবজি, দখলদারিত্ব। এমনকি থাকবে না কোনো ধর্মীয় বিভেদ। সকল নাগরিক তাদের ন্যায্য অধিকার পাবে। সকল ধর্মের মানুষ মিলে মিশে সমাজে একসাথে বসবাস করবে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সম্মানিত ভোটারগণ আমাকে আগামী নির্বাচনে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলে আমি আমার উক্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নে সর্বাত্মক চেষ্টা করব।
তিনি বলেন,স্বাধীনতার পর বিগত ৫৫ বছরে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে অনেকেই এমপি নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রীও হয়েছেন। কিন্তু তাঁরা এমপি-মন্ত্রী হয়ে কেবল নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করেছেন। জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ঠাকুরগাঁওয়ের যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিগত এমপি-মন্ত্রীরা কোনো পদক্ষেপ নেননি। ফলে এখানে অসংখ্য শিক্ষিত বেকার রয়েছেন, যাঁরা সামান্য সহায়তা পেলেই স্বাবলম্বী হতে পারেন। কিন্তু তাঁদের নিয়ে অতীতের কোনো এমপি-মন্ত্রীর পরিকল্পনা ছিল না। বেকারত্ব নিরসনে ঠাকুরগাঁওয়ে ইপিজেড গড়ে তোলা হবে। ঠাকুরগাঁওয়ের বন্ধ বিমানবন্দর চালু করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ঠাকুরগাঁওকে ইকোনমিক জোন হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সব পদে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে। সরকারি কোনো নিয়োগে দলীয়করণ করা হবে না।
মির্জা ফয়সল আমীন, বিএনপি: এ আসনে বিএনপির প্রার্থী রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছোটভাই ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন। যিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার সাবেক মেয়র। বড়ভাই মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির নিয়ন্ত্রণ এখন তার হাতেই। নির্বাচনে দলের একক সমর্থন পাওয়ায় এবং কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকায় বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন তিনি। তবে গুঞ্জন রয়েছে দলের অভ্যন্তরীন কোন্দলের, যে জন্য তাকে কড়া মাশুল দিতে হতে পারে। পিতা ও বড় ভাইয়ের পরিচিতি এবং ক্ষমতাসীন দলের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি কাজে লাগিয়ে আসন্ন উপনির্বাচনে জয়ের মুকুট পরতে চান মির্জা ফয়সল আমীন। বিগত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগের আমলে তার বড় ভাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে শতাধিক রাজনৈতিক মামলা হলেও কোন মামলা হয়নি মির্জা ফয়সল আমীনের নামে। ২০১৫ সালে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র। স্বাচ্ছন্দেই ছিলেন এলাকায়, চালিয়ে গেছেন রাজনীতি ও নিজের ব্যবসা বাণিজ্য।
তিনি বলেন, আমাদের দল বিএনপি ক্ষমতায় রয়েছে, আমার বড়ভাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্ত্রী থাকাকালে যে সকল উন্নয়ন কাজ শুরু করেছেন, তা আমি সম্পন্ন করতে চাই। তাছাড়া আমাদের পরিবার ঠাকুরগাঁওবাসির জন্য যুগ যুগ ধরে কাজ করে আসছে, জনগণ আমাদেরকে তাদের পরিক্ষিত বন্ধু মনে করেন। সব বিবেচনা করে ভোটাররা আমাকে নির্বাচত করবে বলে বিশ্বাস করি।
এদিকে বিএনপি জামায়াত ছাড়াও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ডা. মোঃ খাদেমুুল ইসলাম, খেলাফত আন্দোলনের আব্দুল আলীম নিজামী, বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক নির্বাচনে লড়ছেন। চালিয়ে যাচ্ছেন সীমিত পরিসরে নির্র্বাচনী প্রচারণা। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ডা. মোঃ খাদেমুুল ইসলামের সমর্থনে স্বল্প সংখ্যক নেতাকর্মীকে নির্বাচনের মাঠে দেখা গেলেও খেলাফত আন্দোলন ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের পক্ষে কোন নেতাকর্মী প্রচারণায় মাঠে নেই। সব মিলিয়ে এই তিন প্রার্থীরই জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
সব ঠিক থাকলে নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২৯ অক্টোবর সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত তিনটি উপজেলার ১৮৫টি কেন্দ্রে ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
উল্লেখ্য, এর আগে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তৎকালিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরবর্তীতে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় সংবিধান অনুযায়ী আসনটি শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।
২১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন
ঠাকুরগাও সংবাদদাতা
আগামী ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য ঠাকুরগাঁও-১ (সদর-রুহিয়া-ভূল্লী) আসনের উপনির্বাচনে ২১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল সোমবার সকালে ঠাকুরগাঁওয়ের অপরাজেয় একাত্তরে নির্বাচনী মহড়া মধ্যে দিয়ে ঠাকুরগাঁও ৫০বিজিবির নেতৃত্বে এ কার্যক্রম শুরু হয়।
এ সময় বিজিবির ঠাকুরগাঁও সেক্টর কমান্ডার কর্নেল সুরুজ জানান, উপনির্বাচন উপলক্ষে সকল ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বিজিবি। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন তারা। ঠাকুরগাঁও ১ আসনের তিনটি উপজেলা মিলে নির্বাচনের মোতায়েন থাকবে ২১ প্লাটুন বিজিবি। এছাড়া বডি অন ক্যামেরা, ড্রোন এবং ডগ স্কোয়াডের মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিরীক্ষণ করা হবে। এতে মোট সাড়ে চারশ বিজিবি সদস্য কাজ করবেন।
