সড়কে চলাচলের সময় ট্রাফিক আইন অমান্য করলে চালক কিংবা মোটরযানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে ট্রাফিক পুলিশ।
গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকা, ট্রাফিক সংকেত অমান্য করা, নির্ধারিত গতিসীমার বেশি গতিতে গাড়ি চালানো কিংবা হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানোর মতো বিভিন্ন কারণে মামলা হতে পারে। তবে মামলা হলেই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে জরিমানা পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলে মামলা নিষ্পত্তি করা যায়।
মামলার ধরন, অভিযোগের গুরুত্ব এবং সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান অনুযায়ী জরিমানা বা অন্যান্য শাস্তি নির্ধারিত হয়। তাই মামলা হওয়ার পর কী কারণে মামলা দেওয়া হয়েছে, কী পরিমাণ জরিমানা ধার্য করা হয়েছে এবং কীভাবে তা নিষ্পত্তি করতে হবে, তা জানা জরুরি।
যেসব কারণে মোটরযানের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে
মোটরযান-সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মের কারণে ট্রাফিক পুলিশ মামলা দিতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
১. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকা: গাড়ির বৈধ রেজিস্ট্রেশন সনদ, ফিটনেস সনদ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), ট্যাক্স টোকেন, প্রয়োজনীয় রুট পারমিট এবং চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে মামলা হতে পারে। আইন অনুযায়ী প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অন্যান্য অনুমোদন বা কাগজপত্র না থাকলেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
২. ট্রাফিক আইন অমান্য করা: ট্রাফিক সংকেত অমান্য করা, নিষিদ্ধ পথে গাড়ি চালানো, বিপজ্জনকভাবে দ্রুতগতিতে চলা, অনিয়মিতভাবে লেন পরিবর্তন, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং মোটরসাইকেল চালানোর সময় হেলমেট না পরার কারণে মামলা হতে পারে।
৩. যানবাহনের ত্রুটি: হেডলাইট বা ইন্ডিকেটর নষ্ট থাকা, প্রয়োজনীয় বাতি না থাকা, গাড়ির নির্ধারিত বৈশিষ্ট্য বা পরিচিতিসংক্রান্ত তথ্য প্রদর্শন না করা এবং যানবাহনের কাঠামোয় অনুমোদনহীন পরিবর্তন আনলেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
৪. অনুমোদনহীন পরিবর্তন ও অতিরিক্ত আসন সংযোজন: বিআরটিএর অনুমোদন প্রয়োজন এমন ক্ষেত্রে অনুমতি ছাড়া গাড়ির কাঠামো পরিবর্তন, অতিরিক্ত আসন সংযোজন কিংবা নির্ধারিত ধারণক্ষমতার বাইরে যাত্রী পরিবহন করলে মামলা হতে পারে।
মামলা করবেন কে?
সড়কে ট্রাফিক আইন অমান্য হতে দেখলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারেন। অভিযোগের ধরন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে মামলা দেওয়া, নির্দিষ্ট কাগজপত্র জব্দ করা কিংবা প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করা হতে পারে।
তবে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনুযায়ী মোটরযান আইনের পাশাপাশি ফৌজদারি আইনেও মামলা হতে পারে। দুর্ঘটনায় হতাহত, সম্পদের ক্ষতি বা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকলে বিষয়টি সাধারণ ট্রাফিক মামলার চেয়ে ভিন্নভাবে বিবেচিত হয়।
ট্রাফিক মামলা হলে প্রথমে যা করবেন
মামলা হলে প্রথমেই মামলার কাগজ বা টিকিট ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। কোন ধারায় মামলা হয়েছে, অভিযোগ কী, জরিমানার পরিমাণ কত এবং কোথায় যোগাযোগ করতে হবে—এসব তথ্য দেখে নিতে হবে।
এরপর কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করা যেতে পারে—
মামলার তথ্য যাচাই করুন: মামলা নম্বর, অভিযোগের বিবরণ, সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগ এবং জরিমানার পরিমাণ নিশ্চিত করুন।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করুন: গাড়ির রেজিস্ট্রেশন সনদ, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য নথি প্রস্তুত রাখুন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন: মামলার টিকিটে উল্লেখ করা ট্রাফিক বিভাগ বা নির্ধারিত দপ্তরে যোগাযোগ করে নিষ্পত্তির পদ্ধতি জেনে নিন।
নির্ধারিত পদ্ধতিতে জরিমানা দিন: সরকারি নির্ধারিত পদ্ধতিতে জরিমানা পরিশোধ করুন এবং রসিদ বা লেনদেনের প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
জব্দ করা কাগজপত্র ফেরত নিন: জরিমানা পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর জব্দ করা কাগজপত্র ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
ঢাকায় ট্রাফিক মামলা নিষ্পত্তি করবেন কোথায়?
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করে দায়িত্ব পালন করে। মামলা কোন অঞ্চলের ট্রাফিক পুলিশ দিয়েছে, তা মামলার টিকিট বা সংশ্লিষ্ট নথি থেকে জানতে হবে।
মামলার ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের নির্ধারিত দপ্তর বা অনুমোদিত পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুযোগ থাকতে পারে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী করণীয় জেনে নিতে হবে।
জরিমানার পরিমাণ ও তা কমানোর সুযোগ মামলার ধারা, অপরাধের ধরন এবং প্রযোজ্য আইনগত বিধানের ওপর নির্ভর করে। তাই সব মামলায় একই হারে জরিমানা নির্ধারণ বা মওকুফের সুযোগ রয়েছে—এমন ধারণা করা ঠিক নয়।
জরিমানা না দিলে কী হতে পারে?
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি না করলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। মামলার ধরন ও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী বিষয়টি আদালতে পাঠানো, আদালতের সমন বা ওয়ারেন্ট জারি কিংবা অন্যান্য আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
আদালতের নির্দেশ থাকলে সংশ্লিষ্ট যানবাহন আটক করা বা অন্য ব্যবস্থা নেওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে।
তবে সব ট্রাফিক মামলায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওয়ারেন্ট জারি হয় না। এটি মামলার ধরন, আইনগত প্রক্রিয়া এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
মামলার বিরুদ্ধে আপত্তি থাকলে করণীয়
চালক বা গাড়ির মালিক মনে করলে যে তাঁর বিরুদ্ধে ভুলভাবে মামলা দেওয়া হয়েছে, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ বা আপত্তি জানাতে পারেন। প্রয়োজন হলে আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে আদালতে আইনি প্রতিকার চাওয়ার সুযোগও রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে মামলার কপি, গাড়ির বৈধ কাগজপত্র, সংশ্লিষ্ট ছবি বা ভিডিও এবং অভিযোগের পক্ষে প্রাসঙ্গিক অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
জরিমানা দেওয়ার আগে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
মামলা নিষ্পত্তির সময় অবশ্যই নির্ধারিত সরকারি পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা মধ্যস্থতাকারীর হাতে রসিদ ছাড়া টাকা দেওয়া উচিত নয়। জরিমানা পরিশোধের পর রসিদ সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বুঝে নেওয়া জরুরি।
পাশাপাশি গাড়ির কাগজপত্রের মেয়াদ নিয়মিত যাচাই, ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং যানবাহন সচল ও নিরাপদ রাখা হলে মামলা হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
মনে রাখবেন: ট্রাফিক মামলা নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট নিয়ম, জরিমানার পরিমাণ এবং আপিল বা আপত্তি জানানোর পদ্ধতি সময় ও মামলার ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগ, বিআরটিএ বা আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।