রাজধানীর ধানমন্ডি লেক আধুনিক ও নান্দনিক বিনোদনকেন্দ্রে রূপ দিতে ৭৫ কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। পরিকল্পনার আওতায় লেকের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, দুর্গন্ধ ও দূষণ কমানো, হাঁটারপথ সংস্কার, স্মার্ট এলইডি বাতি ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পাশাপাশি যুক্ত করা হবে আধুনিক জিম, ক্যাফেটেরিয়া, ব্যাডমিন্টন কোর্ট ও উন্মুক্ত ব্যায়ামাগার। এ ছাড়া লেকপাড়ে গড়ে তোলা হবে ‘নজরুল সরোবর’ নামে উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে লেকের তলদেশ থেকে বছরের পর বছর জমে থাকা কাদা-মাটি ও বর্জ্য অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে। লেকের পানির মান উন্নয়ন ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি নাগরিকদের বিনোদন ও শরীরচর্চার সুযোগ বাড়িয়ে ধানমন্ডি লেকের চেনা দৃশ্যপট বদলে দিতে চায় সংস্থাটি।
ধানমন্ডির প্রাণ এই লেকের দুই পাশ দিয়ে রয়েছে অসংখ্য গাছ। মাঝে মাঝেই স্থাপন করা হয়েছে বসার জায়গা। হাঁটারপথ বা ওয়াকওয়ের পাশেই রয়েছে শরীর চর্চার যন্ত্রপাতি। অর্থাৎ লেক শুধু মনোরম পরিবেশের জন্য না শারীরিক সুস্থতারও একটা প্রাণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
গতকাল সোমবার সরেজমিন দেখা গেছে, লেকের ভেতরে কাদা মাটি উত্তোলনের পাশাপাশি ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ
চলছে। লেকের পানি পরিচ্ছন্ন রাখতে নিয়মিত ভিজিলেন্স টিম রাখা হয়েছে। তাই দুর্গন্ধ আগের চেয়ে কম। মানুষও লেক পাড়ে চলাচল করে স্বস্তি পাচ্ছে।
প্রায় বছরব্যাপী এই সংস্কার কাজ চলবে। ৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৫৬ মিটার গড় প্রস্থের এই লেকে জমা হওয়া প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৩৪ ঘনমিটার স্লাজ (কাদা ও বর্জ্য) অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৭০০ ঘনমিটার স্লাজ অপসারণে ২টি ভাসমান এক্সকাভেটর ও ৪টি বার্জ ব্যবহার করা হচ্ছে। পুনঃখনন কাজের প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২৬ কোটি টাকা। ১৯৬০-এর দশকে পুরনো পা-ু নদীর অবশিষ্টাংশ নিয়ে গড়ে ওঠা প্রায় ৮৬ একরের এই স্থানে বর্তমানে জলাশয়ের পরিমাণ ৫৫ একর।
লেক সংস্কারের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, লেকের তলদেশ পরিষ্কারের পরপরই পানি শোধন, সাইডওয়াল সংস্কার, ওয়াকওয়ে আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ, সৌন্দর্যবর্ধন এবং লাইটিংয়ের কাজ শুরু হবে। শিশুদের জন্য স্পিডবোটের সুযোগসহ পুরো ধানমন্ডি এলাকার রাস্তা, ফুটপাত ও সার্বিক অবকাঠামো সাজানো হবে। এ ছাড়া রবীন্দ্র সরোবরের মতো এখানে ‘নজরুল সরোবর’ নামে একটি আধুনিক উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।
সংস্কারের পর লেকের আশপাশের বাড়ি এবং রাস্তা থেকে বৃষ্টির পানি দ্রুত লেকে নেমে যাওয়ার জন্য করা হচ্ছে একাধিক সংযোগ লাইন। তবে সেই পানি শোধন করেই লেকে নামানোর ব্যবস্থা করা হবে। যার ফলে পুনরায় আর দুর্গন্ধ ছাড়াবে না। পুরো লেক থাকবে সিসি ক্যামেরার আওতায়। এ ছাড়া লেকের সীমানাবেষ্টনী ও নিরাপত্তা রেলিং মেরামত করা হচ্ছে। পাশাপাশি এনাউন্সমেন্ট সিস্টেম এবং নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা হচ্ছে। অর্থাৎ লেকপাড়ে ঘুরতে আসা মানুষের নিরাপত্তায় থাকবে সিসি ক্যামেরার চোখ। থাকবে আধুনিক লাইব্রেরি ও জিমনেসিয়াম। দৃষ্টিনন্দন ফুডকোড। সবমিলিয়ে ধানমন্ডি লেক হবে আধুনিক বিনোদন কেন্দ্র।
৩টি ভাসমান ডেক, কিয়স্ক, আধুনিক জিম, ক্যাফেটেরিয়া, ব্যাডমিন্টন কোর্ট, উন্মুক্ত ব্যায়ামাগার এবং পার্কিং সুবিধা। এ ছাড়া থাকবে উদ্ভিদের চিকিৎসায় বিশেষায়িত ‘ট্রি হাসপাতাল’, নিরাপদ খাবার পানি এবং জনবান্ধব শৌচাগার।
?বছরের পর বছর ধরে সৃষ্টি হওয়া জলাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত ক্ষয় ও পরিবেশগত ক্ষতি দূর করে ধানমন্ডি লেক পুনরুদ্ধার এবং আধুনিক বিনোদনকেন্দ্রে রূপ দিতে ডিএসসিসি মোট ৭৫ কোটি টাকার মাস্টারপ্ল্যান হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে ৫০ কোটি টাকা লেক ও অবকাঠামো সংস্কারে এবং ২৫ কোটি টাকা ‘নজরুল সরোবর’ (বিদ্রোহী চত্বর) নির্মাণে ব্যয় হবে।
কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের ঠিক বিপরীতে ধানমন্ডির ১৩/এ ও ৮/এ সড়কের পাশে ৫০ দশমিক ৯৬৭ কাঠা জমিতে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তোলা হবে। এতে থাকবে ?নজরুলসংগীত, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনার জন্য উন্মুক্ত অ্যাম্ফিথিয়েটার ও গ্রিনরুম। ?নজরুলের জীবন, সাহিত্যকর্ম ও বিদ্রোহী চেতনাভিত্তিক বুক কর্নার, লাইব্রেরি, তথ্যফলক, নগর বন, প্লাজা ও লেকের ঘাট। ?কবি কাজী নজরুল ইসলামের পছন্দের খাবার পরিবেশনকারী বিশেষ রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে। লেকের তলদেশ স্লাজমুক্ত করার পরপরই মূল সংস্কার ও নজরুল সরোবরের কাজ একযোগে বাস্তবায়ন করা হবে।
