বিদেশি নাগরিকদের সন্তানদের অবৈধভাবে থাই নাগরিকত্ব পাইয়ে দিতে অর্থের বিনিময়ে থাই পুরুষদের ভুয়া বাবা হিসেবে দেখানোর একটি চক্রের বিরুদ্ধে তদন্তের পরিধি বাড়িয়েছে থাইল্যান্ডের পুলিশ। এ ঘটনায় ৪৬ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তদন্তের তৃতীয় পর্যায়ে ২৪ জনের নাগরিকত্বের বৈধতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় আটটি হাসপাতালের সংশ্লিষ্টতার তথ্যও পাওয়া গেছে।
থাইল্যান্ডের অভিবাসন ব্যুরোর কমিশনার পুলিশ লেফটেন্যান্ট জেনারেল নপ্পাসিলপ পুনসাওয়াত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জানান, বেসরকারি হাসপাতালের মাধ্যমে ভুয়া জন্মনিবন্ধন এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার পর জাতীয় পুলিশপ্রধান পুলিশ জেনারেল সামরান নুয়ালমার নির্দেশে তদন্ত শুরু হয়।
তদন্তের প্রথম পর্যায়ে তিন শিশুর তথ্য পাওয়া যায় এবং ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ২২ শিশুর তথ্য পাওয়া যায় এবং গ্রেপ্তার করা হয় ৩৬ সন্দেহভাজনকে।
২৪ জনের ডিএনএ পরীক্ষায় জন্মসনদে বাবা হিসেবে উল্লেখ করা থাই পুরুষদের সঙ্গে কারও জৈবিক সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। পরীক্ষায় তাদের মা এবং সম্ভাব্য জৈবিক বাবাদের নমুনাও তুলনা করা হয়।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানার তালিকায় সরকারি কর্মকর্তা, হাসপাতালের কর্মী, বিদেশি মা, পিতৃত্ব স্বীকার করা থাই পুরুষ, প্রকৃত বিদেশি বাবা এবং নাগরিক নিবন্ধন-সংক্রান্ত অধিকার অপব্যবহারে জড়িত ব্যক্তিরা রয়েছেন।
তদন্তে উঠে আসা একটি ঘটনায় ২৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তির জন্মসনদে থাই বাবার নাম এবং চীনা মায়ের পরিচয় ছিল। তবে ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা যায়, তার প্রকৃত বাবা একজন চীনা নাগরিক।
ব্যাংককের বাং খুন থিয়ান এলাকায় ওই ব্যক্তির বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখানে একজন চীনা পুরুষ ও ওই ব্যক্তির মাকেও পাওয়া যায়। তারা একই পরিবারের সদস্য হিসেবে বসবাস করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওই ব্যক্তি কিং মংকুটস ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থনবুরি থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। তিনি সামুত প্রাকানের একটি বৈদ্যুতিক তার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন এবং মাসে প্রায় ৩০ হাজার থাই বাত আয় করেন।
জন্মসনদে বাবা হিসেবে নাম থাকা থাই পুরুষটি জানান, ২৭ বছর আগে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ওই ব্যক্তির মায়ের সঙ্গে বিয়ে নিবন্ধন করতে তাকে পাঁচ হাজার থাই বাত দেয়া হয়েছিল।
তদন্তে ২৩ বছর বয়সী যমজ দুই ভাইয়ের ঘটনাও উঠে এসেছে। ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে, তাদের জন্মসনদে বাবা হিসেবে উল্লেখ করা থাই পুরুষটি তাদের জৈবিক বাবা নন।
যমজদের একজন দেশের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী। চোনবুরি প্রদেশের সি রাচা জেলার একটি হাসপাতালে প্রশিক্ষণ চলাকালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যজন হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। তিনি প্রোগ্রামার হিসেবে কাজ করেন এবং মাসে প্রায় ৫০ হাজার থাই বাত আয় করেন। তাকে ক্রুং থন বুরি এলাকার একটি কনডোমিনিয়াম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
যমজদের জন্মসনদে বাবা হিসেবে উল্লেখ করা থাই পুরুষটি মাদক-সংক্রান্ত অপরাধে কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তার ২০৩৭ সালের ২৭ আগস্ট মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে।
যমজদের মা, যিনি আগে সু জিয়ান নামে পরিচিত ছিলেন, দুই ছেলের পরিচয়পত্র পেতে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার ভূমিকার কারণে পরিচয়পত্র-সংক্রান্ত আইনে গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিয়ের মাধ্যমে তিনি কীভাবে থাই নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন, তা-ও খতিয়ে দেখছে কর্তৃপক্ষ। নাগরিকত্ব পাওয়ার পর তিনি ওই থাই নাগরিককে তালাক দেন।
আরেক ঘটনায় সাত ও তিন বছর বয়সী দুই ছেলের জন্মসনদে একই মায়ের নাম থাকলেও বাবা হিসেবে দুই ভিন্ন থাই পুরুষের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। ডিএনএ পরীক্ষায় সাত বছর বয়সী শিশুটির প্রকৃত বাবা একজন বিদেশি নাগরিক বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ওই শিশুর জন্মসনদে বাবা হিসেবে নাম থাকা একজন মোটরসাইকেল ট্যাক্সিচালক স্বীকার করেছেন, নিবন্ধনের জন্য তাকে পাঁচ হাজার থাই বাত দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে, তিন বছর বয়সী শিশুটির জন্মসনদে বাবা হিসেবে নাম থাকা থাই পুরুষটির মোট ১০টি ব্যবসা রয়েছে। এর মধ্যে যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী একটি কারখানাও রয়েছে।
সামুত প্রাকানে একটি বাড়িতে দুই শিশুর সঙ্গে থাকা অবস্থায় বিদেশি ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাড়িটি এমন একটি কোম্পানির নিবন্ধিত ঠিকানা, যার একজন শেয়ারহোল্ডার তাদের মা। কোম্পানিটি অন্যের নামে ব্যবসা পরিচালনার ব্যবস্থা বা ‘নমিনি অ্যারেঞ্জমেন্ট’-এর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা তদন্ত করছে কর্তৃপক্ষ।
তদন্তের আওতায় থাকা ২৪ জনের নাগরিক নিবন্ধন-সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা ও সংশোধন করা হবে। তারা অবৈধভাবে থাই নাগরিকত্ব পেয়ে থাকলে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট নথি বাতিল এবং নাগরিকত্বের মর্যাদা প্রত্যাহার করা হবে। তবে এ ক্ষেত্রে শিশুদের অধিকার ও সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় রাখা হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, এ চক্রের সঙ্গে জড়িত নিয়োগকারী, মধ্যস্থতাকারী, নিবন্ধনে সুপারিশকারী, সরকারি কর্মকর্তা এবং চূড়ান্ত সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করতে তদন্ত আরও বিস্তৃত করা হবে। নাগরিক নিবন্ধনব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে অধিকার আদায় ও আইন এড়ানোর সুযোগ বন্ধ করাই তাদের লক্ষ্য।
সূত্র: দ্য ন্যাশন
