Published on
:
3 min read
আশিস নন্দী গাইঘাটা
ঠিক যেন ৭ জুলাই গভীর রাতের অ্যাকশন রিপ্লে সোমবার, ২৬ অক্টোবর গভীর রাতে। নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় অভিযুক্তকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করাতে গেল পুলিশ। সেই সময়ে এক পুলিশ অফিসারের সার্ভিস রিভলভার কেড়ে নিয়ে পুলিশের দিকে গুলি ছুড়ে সে পালাতে গেল। পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে প্রাণ হারাল সেই অভিযুক্ত।
বারুইপুরের পরে গাইঘাটা। প্রভাস মণ্ডলের পরে প্রহ্লাদ দাস। বনগাঁ জেলা পুলিশ সূত্রে যা জানানো হয়েছে, সেই তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের মতো উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটাতেও কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্তর এক সাব–ইনস্পেক্টরের রিভলভার কেড়ে গুলি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা ও পুলিশের পাল্টা গুলিতে তার প্রাণ হারানোর ঘটনার সময় মধ্যরাতের পরে এবং বারুইপুরের মতো গাইঘাটারও ঘটনাস্থলে জলাজমি। তবে বারুইপুরে প্রভাস মণ্ডলকে লক্ষ্য করে পাল্টা দু’রাউন্ড গুলি চালায় বলে পুলিশের বিবৃতিতে সেই সময়ে বলা হয়েছিল। আর গাইঘাটায় ২৩ বছরের প্রহ্লাদ দাসকে লক্ষ্য করে, পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, চালানো পাল্টা গুলির তিন রাউন্ড তার মাথায়, কাঁধে ও বুকে লেগেছে। অর্থাৎ, সব ক’টি গুলি লেগেছে শরীরের উপরের অংশে। পাল্টা কিংবা আত্মরক্ষার্থে প্রতিপক্ষের দেহের নীচের অংশে, বিশেষ করে পা লক্ষ্য করে পুলিশের গুলি চালানোই নিয়ম। তা হলে কেন এর অন্যথা হলো, বনগাঁ জেলা পুলিশ সূত্রে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত তার ব্যাখ্যা মেলেনি।
তবে গাইঘাটার প্রহ্লাদ দাস প্রাণ হারানোর কিছুক্ষণ আগে, হয়তো কাকতালীয় ভাবেই, নিজের বাড়িতে গিয়ে পরিজনদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেয়েছে। সেই সুযোগ তাকে করে দেয় পুলিশই। সোমবার তখন রাত ২টো। বনগাঁ জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বিশাল পুলিশ বাহিনী প্রহ্লাদকে মহিষাকাঠি গ্রামে তার বাড়িতে নিয়ে যায়। পুলিশের কনভয়ে ছিল তিনটি গাড়ি, মধ্যিখানের গাড়িতে ছিল প্রহ্লাদ। বাড়ির সকলে তখন ঘুমিয়ে। পুলিশি প্রহরায় বাড়িতে ঢুকে প্রহ্লাদ তার ভাইকে ডেকে তোলে, নিজের ঘরে ভাইকে জড়িয়ে সে কান্নাকাটি করে। সব মিলিয়ে মিনিট পাঁচেক প্রহ্লাদ বাড়িতে ছিল। বাড়ি থেকে বেরনোর আগে প্রহ্লাদ তার মায়ের হাত থেকে এক গ্লাস জল খায় বলে পুলিশ জানিয়েছে। ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পুনর্নির্মাণের আগে অভিযুক্তকে অত রাতে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো কেন, সেই প্রশ্নেরও উত্তর মেলেনি পুলিশের কাছ থেকে। তা ছাড়া, বারুইপুরের মতো গাইঘাটাতেও প্রশ্ন উঠেছে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করানোর জন্য অভিযুক্তকে অত রাতে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। অভিযুক্তর সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে জল ভর্তি ফসলের জমিতে পড়ে গিয়ে এক পুলিশ অফিসার আহত হয়েছেন।
বনগাঁ পুলিশ জেলার এসপি বিদিশা কলিতা দাশগুপ্ত নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্তর এনকাউন্টার নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি।
পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো প্রহ্লাদের মা এনকাউন্টার প্রসঙ্গে বলেন, ‘পুলিশ যদি এনকাউন্টার করে থাকে, তা হলে ভালো হয়েছে। মা হিসেবে খুশি না–হলেও এক জন নাগরিক হিসেবে আমি খুশি হয়েছি। এর পরে কোনও পুরুষ যেন কোনও মহিলার সঙ্গে এ রকম কিছু ঘটানোর সাহস না–পায়।’ প্রহ্লাদের ভাই বলেন, ‘আমার দাদা শান্ত স্বভাবের। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, ও পুলিশের কাছ থেকে বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে গুলি করে পালাতে যাবে। তবে পুলিশ যখন বলছে, তখন তো মানতেই হবে।’
গত শনিবার, ২৪ অক্টোবর রাতে প্রহ্লাদ তার পরিচিত, ক্লাস ইলেভেনের ছাত্রী ওই কিশোরীকে গাইঘাটার রামচন্দ্রপুর বাজারে একটি জলসায় ডেকে আনে এবং তার পরে জলসার মঞ্চ থেকে ১৫০ মিটার দূরে নিয়ে গিয়ে ওই নাবালিকাকে সে ধর্ষণ ও খুন করে বলে অভিযোগ উঠেছে। রবিবার সকালে মহিষাকাঠি গ্রামের বাড়ি থেকে প্রহ্লাদকে গাইঘাটা থানার পুলিশ গ্রেপ্তার করে। প্রহ্লাদের রক্তমাখা পোশাক তার বাড়ি থেকে উদ্ধার করেন তদন্তকারীরা।
পুলিশের বক্তব্য, প্রহ্লাদকে এনকাউন্টারের ঘটনাটি ঘটে সোমবার রাত ২টো ৪০ মিনিটে গাইঘাটা এলাকার শিমুলপুরের বৈদ্যবাড়ি মোড়ের কাছে। পুলিশ সূত্রের খবর, প্রহ্লাদকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ তখন করানো হয়ে গিয়েছে। প্রহ্লাদকে নিয়ে গাইঘাটা থানার উদ্দেশে রওনা হয়েছে পুলিশ রওনা। রামচন্দ্রপুর পেরিয়ে পুলিশের কনভয় বৈদ্যবাড়ির মোড়ে পৌঁছলে প্রহ্লাদ গাড়ি থামানোর কথা বলে। সে জানায়, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া প্রয়োজন। অত রাতে রাস্তা তখন স্বভাবতই সুনসান। পুলিশের কনভয় থামে রাস্তার বাঁ দিক ঘেঁষে। পাশেই ধানখেত, সেখানে জল জমে রয়েছে। প্রহ্লাদকে রাস্তায় ওই জায়গায় নামানো হয়। সেই সময়ে ওই অভিযুক্তর খুব কাছেই পাহারায় ছিলেন গাইঘাটা থানার সাব–ইনস্পেক্টর অভীক কোটাল।
পুলিশের দাবি, গাড়ি থেকে নামার কয়েক সেকেন্ড পরেই প্রহ্লাদ আচমকা এসআই অভীক কোটালের সার্ভিস রিভলভার কোমর থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পুলিশ বাহিনীর দিকে তাক করে গুলি চালায়। কোনও পুলিশকর্মী বা অফিসারের গায়ে না–লাগলেও ওই গুলি পুলিশের একটি গাড়ির কাচে লাগলে কাচ ভেঙে যায়। প্রহ্লাদের হাত থেকে সার্ভিস রিভলভার কাড়তে ও তাঁকে কাবু করতে যান এসআই অভীক। সেই সময়ে ধস্তাধস্তিতে ওই এসআই জল জমে থাকা ফসলের মাঠে পড়ে গিয়ে চোট পান। পুলিশের বক্তব্য, তার পরেই নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য প্রহ্লাদকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। ওই তিন রাউন্ড গুলি এক জন নাকি একাধিক পুলিশকর্মী–অফিসার চালিয়েছিলেন, তাঁরা কারা, মোট ক’রাউন্ড গুলি পুলিশ চালিয়েছে— এ সব নিয়ে পুলিশের তরফে কিছু বলা হয়নি। আবার, সেলুনের ব্যবসা করা এক জন যুবক ঘুটঘুটে অন্ধকারে এক জন পুলিশ অফিসারের কোমর থেকে কী ভাবে তাঁর সার্ভিস রিভলভার কেড়ে নিয়ে গুলি চালাতে পারল, সেই রিভলভারে সেফটি ক্যাচ থাকলে সেটা সে অন–ই বা করতে পারল কী ভাবে, এই সব প্রশ্নেরও উত্তর মেলেনি।
গুলিবিদ্ধ প্রহ্লাদ দাসকে উদ্ধার করে ঠাকুরনগর হাসপাতালে পুলিশ নিয়ে গেলে সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। আহত সাব–ইনস্পেক্টরের চিকিৎসা চলছে।ময়না–তদন্তের জন্য মঙ্গলবার বিকেলে প্রহ্লাদের মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বারাসত মেডিক্যাল কলেজ হাসপতালে। তিন জন চিকিৎসক ময়না–তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন। ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে হওয়া ময়না–তদন্তের ভিডিয়োগ্রাফি করা হয়েছে।