মহান স্রষ্টাতো মানববান্ধব করে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতির দিকে তাকালে, জীববৈচিত্র্যের দিকে তাকালে তা উপলব্ধি করা যায়। কিন্তু প্রকৃতির প্রতি মানুষের আচরণ কেমন? বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নামে, শিল্পবিপ্লবের নামে উন্নত দেশগুলো কী করেছে? তাদের আগ্রাসী আচরণে সৃষ্টি হয়েছে জলবায়ু সঙ্কট, বাড়ছে পৃথিবীর উত্তাপ। চলতি বছর ভয়াবহ তাপপ্রবাহের শিকার হয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। গরমে অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল জনজীবন। গরমের তীব্রতা এতটাই অসহনীয় ছিল যে, এতে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ‘নেচার হেলথ’ জার্নালে প্রকাশিত দু’টি গবেষণাপত্র থেকে এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, মোট মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৩২ হাজার ৬০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর পেছনে সরাসরি ভূমিকা রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের, যা মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতা। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের ‘চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন’ বিষয়ক গবেষক এবং এ গবেষণাপত্রগুলোর প্রধান লেখক ক্লেয়ার বার্নস বলেন, ‘ইউরোপের বড় একটি অংশে তাপজনিত মৃত্যুর দিক থেকে ২০২৬ সালের গ্রীষ্মকাল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সময় ছিল।
মর্মান্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যান এমন এক সময়ে আমাদের সামনে এসেছে, যখন বিশ্বনেতারা জাতিসংঘের বার্ষিক জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্কে সমবেত হতে যাচ্ছেন। এর কয়েকদিন আগেই জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সম্ভাবনা এখন আর নেই। বর্তমানে ইউরোপ হলো বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হতে থাকা একটি মহাদেশ। এখানকার চরম তাপপ্রবাহ অসহনীয় পর্যায়ে ঠেকেছে। চলতি বছরের মে মাসের শেষ থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত নজিরবিহীন তীব্র তাপপ্রবাহের শিকার হয়েছে পুরো মহাদেশটি। এবারের গ্রীষ্মকাল ছিল পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসে উষ্ণতম গ্রীষ্মকাল, যেখানে তাপমাত্রা ১৯৯১-২০২০ সালের গড়ের চেয়ে প্রায় ২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এমন কি কিছু কিছু দিনে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি ছিল।
এদিকে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) বলেছে, বিশ্বকে আগামী চার বছরের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ১৮ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কমাতে হবে। তা না হলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে আমেরিকা প্যারিস চুক্তি থেকে সরে গেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী দেশটি গ্রিন হাউস গ্যাস কমার দীর্ঘদিনের প্রবণতাও উল্টে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। ক্লাইমেট অ্যানালিটিকসের প্রধান বিল হেয়ার বলেন, সব দেশেরই দায়িত্ব রয়েছে। তবে আমেরিকা ও সৌদি আরবের মতো বড় জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান বদলে বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা মেনে চলা জরুরি। ইউএনইপির মতে, দ্রুত বৈশ্বিক উষ্ণতা কমানোর একটি কার্যকর উপায় হলো মিথেন গ্যাসের নির্গমন কমানো। কার্বনডাই অক্সাইডের তুলনায় এ গ্রিনহাউস গ্যাসের উষ্ণায়ন ক্ষমতা প্রায় ৮০ গুণ বেশি। কার্বন বলি মিথেন— এসব গ্যাসের নির্গমন কমানোর সামর্থ্য যাদের আছে, তাঁরা সুবচন মানবেন কী? ক্ষমতাবানরা না মানার কারণেই তো আজ বিশ্বের এ দুর্দশা।
