বাঁকখালী নদীর বুকে বর্ণিল কল্পজাহাজ, ফানুসের আলো, গান-বাজনা আর হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠেছিল কক্সবাজারের রামু। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে আয়োজিত কল্পজাহাজ ভাসানো উৎসব পরিণত হয় বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলায়। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি বিহার-প্যাগোডায় চিত্রকল্পের মাধ্যমে স্মরণ করা হয় ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের সেই কালরাত, রামু ট্র্যাজেডি এবং বিচারহীনতার ১৪ বছর।
‘সম্প্রীতির জাহাজে, ফানুসের আলোয় দূর হোক সাম্প্রদায়িক অন্ধকার’ স্লোগানে সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাঁকখালী নদীতে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবে বাঁশ, কাঠ, বেত ও রঙিন কাগজে তৈরি দৃষ্টিনন্দন সাতটি কল্পজাহাজ নৌকায় স্থাপন করে নদীতে ভাসানো হয়। প্রতিটি জাহাজে ফুটিয়ে তোলা হয় বুদ্ধের প্রতিকৃতি, বৌদ্ধবিহার, জাদি, হাতি, হরিণ, হাঁস, ড্রাগনসহ বিভিন্ন প্রাণীর অবয়ব। কারুকাজ ও বৈচিত্র্যে ভরা এসব কল্পজাহাজ নদীর এপার থেকে ওপারে ঘুরে বেড়ালে দর্শনার্থীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় উচ্ছ্বাস। ভাসমান জাহাজে বৌদ্ধ কীর্তন, ঢোল-কাঁসাসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের সুর, গান ও নাচে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে নদীর দুই তীর। ফানুস ওড়ানোসহ নানা আয়োজনে বৌদ্ধ নারী-পুরুষের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে উৎসবটি রূপ নেয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য সম্মিলনে।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বিকেল সাড়ে ৫টায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, সব অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে। জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে সবাইকে অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে। কোনো ধর্মের পরিচয় ব্যবহার করে অন্যায় করা কিংবা মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা হলে তা প্রতিহত করতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘যে বাগানে একরকম ফুল থাকে, সে বাগান সুন্দর হতে পারে না। যে বাগানে হরেক রকম ফুল থাকে, সেই বাগান হয় সুন্দর ও সমৃদ্ধ।’ বাংলাদেশকে সুন্দর ও সমৃদ্ধ রাখতে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।

রামুর কল্পজাহাজ ভাসানো উৎসবে এসে আবেগাপ্লুত হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এমন আয়োজন তিনি আগে কোথাও দেখেননি। বাঁকখালী নদীর দুই তীরে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করে, রামু শান্তি ও সম্প্রীতির জনপদ। পাহাড় ও সমতলের মানুষ এভাবেই মিলেমিশে থাকতে চায়। বর্তমান সরকার এ লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান ড. সুকোমল বড়ুয়া। তিনি বলেন, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের এক প্রান্তে আয়োজন করা হলেও রামুর কল্পজাহাজ ভাসানো উৎসব দেশের সীমানা ছাড়িয়ে চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচিতি ও প্রভাব বিস্তার করেছে। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, বৌদ্ধদের প্রবারণা উৎসব জাতীয় সংস্কৃতির অন্যতম উৎসবে পরিণত হতে পারে। প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে সরকারি ছুটির দাবির প্রতিও তিনি একাত্মতা প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, রামু সম্প্রীতির দিক থেকে দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ উপজেলা। ২০১২ সালে রামুর বৌদ্ধবিহারে সংঘটিত সহিংসতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সে সময়ের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর চিত্রের মাধ্যমে বুঝা যায়, এ ঘটনায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দলীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার বিষয় উঠে এসেছিল। পরবর্তী সময়ে তদন্তের নামে মিথ্যা মামলায় অনেক নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
সংসদ সদস্য বলেন, প্রকৃত অপরাধীরা যাতে কোনোভাবেই পার পেয়ে না যায়, সে জন্য পুনঃতদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জোরালোভাবে বিষয়টি তুলে ধরবেন বলেও জানান তিনি।
রামু মৈত্রী বিহারের অধ্যক্ষ বিজয় রক্ষিত মহাথেরো আশীর্বাদক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এতে সংবর্ধিত অতিথির বক্তব্য দেন বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সাথি উদয় কুসুম বড়ুয়া। সভাপতিত্ব করেন রামু কেন্দ্রীয় প্রবারণা ও জাহাজ ভাসা উৎসব উদযাপন পরিষদের সভাপতি বিপ্লব বড়ুয়া।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শহিদুল আলম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ মাহমুদুল হাসান, রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান, রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কে ফজলুল হক এবং বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সুজন বড়ুয়া নিপু। বিশেষ আলোচকের বক্তব্য দেন এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী সম্পাদক শহিদুল আজম। স্বাগত বক্তব্য দেন উৎসব উদযাপন পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক অর্পন বড়ুয়া। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দয়াল বড়ুয়া ও সংগীতশিল্পী-শিক্ষক মানসী বড়ুয়া। এ অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারাও বক্তব্য দেন।
উৎসব উদযাপন পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক অর্পন বড়ুয়া জানান, এবার সাতটি কল্পজাহাজ উৎসবে অংশ নেয়। রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের হাজারীকুল, মেরংলোয়া, হাইটুপি, শ্রীকুল ও দ্বীপ শ্রীকুল, রাজারকুল ইউনিয়নের পূর্ব রাজারকুল এবং জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের উত্তর মিঠাছড়ি বড়ুয়াপাড়া গ্রাম থেকে এসব কল্পজাহাজ আনা হয়।
তিনি বলেন, প্রবারণা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব, যা আশ্বিনী পূর্ণিমায় পালিত হয়। এ সময় ভিক্ষুসংঘ নিজেদের দোষত্রুটি প্রকাশ ও প্রায়শ্চিত্তের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন করেন। বিনয়াচার, আদর্শ জীবনযাপন এবং অন্যায় ও ধর্মাচারবিরোধী কাজ পরিহারের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে প্রবারণা উৎসবের তাৎপর্য প্রকাশ পায়।

কল্পজাহাজ ভাসানোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, ১৯৫৬ সালের আগ পর্যন্ত তৎকালীন রাখাইন ও মঘ সম্প্রদায়ের মানুষ রামুর বাঁকখালী নদীতে কল্পজাহাজ ভাসানো উৎসব উদযাপন করতেন। পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলে তাঁদের আধিক্য কমতে শুরু করলে বড়ুয়া বৌদ্ধরা ঐতিহ্যটি ধরে রাখেন।
তিনি জানান, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে এ উৎসবের সূচনা হয়েছিল বলে প্রচলিত রয়েছে। প্রায় দুইশ বছর আগে মিয়ানমারের মুরহন ঘা নামক স্থানের একটি নদীতে মংরাজ মাজংব্রান নামের এক ব্যক্তি এ উৎসবের প্রচলন করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু আরও বলেন, বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুযায়ী, বুদ্ধের সময়ে বৈশালী রাজ্যে দুর্ভিক্ষ, মহামারি ও নানা উপদ্রব দেখা দিলে সেখানকার রাজা বুদ্ধের শরণাপন্ন হন। বুদ্ধ পাঁচশ অরহৎ ভিক্ষুকে সঙ্গে নিয়ে রাজগৃহ থেকে গঙ্গা নদীপথে বৈশালীতে যান। মগধরাজ বিম্বিসার নৌকা সুসজ্জিত করে বুদ্ধের যাত্রার ব্যবস্থা করেন। বুদ্ধের আগমনে বৈশালীর উপদ্রব দূর হয়। পরে ফেরার পথে দেবতা, ব্রহ্মা ও নাগরাজাও তাঁকে পূজা করেন। প্রবারণা পূর্ণিমার সঙ্গে সম্পর্কিত এ স্মৃতিকে ধারণ করেই বৌদ্ধরা কল্পজাহাজ ভাসিয়ে উৎসবটি উদযাপন করেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উৎসব উদযাপন পরিষদের সভাপতি বিপ্লব বড়ুয়া ও সাধারণ সম্পাদক দয়াল বড়ুয়া জানান, প্রাচীন জনপদ রামুর হাজার বছরের বৌদ্ধিক ঐতিহ্য ও শত বছরের সাংস্কৃতিক নিদর্শন বহন করছে শুভ প্রবারণা পূর্ণিমার কল্পজাহাজ ভাসানো উৎসব। আষাঢ়ী পূর্ণিমায় তথাগত বুদ্ধের প্রজ্ঞাপিত বর্ষাব্রত শুরু হয়। তিন মাস ধরে দান, শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার অনুশীলনের মধ্য দিয়ে বর্ষাবাস সমাপ্ত হয় শুভ প্রবারণা পূর্ণিমায়।
তাঁরা বলেন, ফানুসবাতি উত্তোলন ও কল্পজাহাজ ভাসানো উৎসব রামুতে প্রতিবছর মর্যাদা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে উদযাপিত হয়। এ আয়োজন কেবল ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধারক নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও প্রতীক।
The post রামুতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সম্মিলন কল্পজাহাজ ভাসানো উৎসব অনুষ্ঠিত appeared first on আমাদের রামু.
