আগের মতো মাছ নেই, হতাশ স্থানীয়রা
২ ঘণ্টা আগে
![]()
এস দিলীপ রায়
ছবি: এস দিলীপ রায়
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী বিলে শুরু হয়েছে মাছ ধরার উৎসব। প্রতিবছর এই সময়ে সপ্তাহব্যাপী চলে এই আয়োজন। তবে উৎসবের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মাঝেও স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ, কারণ বিলে আগের মতো আর দেশি মাছ মিলছে না।
উৎসব ঘিরে স্থানীয়দের পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা লোকজন চাক জাল হাতে সারিবদ্ধভাবে বিলে নামছেন। বিলে জাল ফেললেই কারও জালে উঠে আসছে টাকি, শিং, কই কিংবা পুঁটির মতো দেশি মাছ; আবার অনেকেই দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করেও খালি হাতে ফিরছেন হতাশ হয়ে।
মাছ ধরতে আসা লোকজন বলছেন, ৫০–৫৫ একর আয়তনের এই বিলে সাত-আট বছর আগেও এক দিনে চাক জাল দিয়ে ১০–২০ কেজি পর্যন্ত মাছ ধরা যেত। এখন অনেকের ভাগ্যে জুটছে মাত্র এক থেকে তিন কেজি।
চলতি বছর মাছের প্রাপ্যতা আরও কমেছে বলে জানান তারা। তবে মাছের উৎপাদন কিংবা প্রজাতিভিত্তিক সাম্প্রতিক কোনো জরিপ না থাকায় এই কমার প্রকৃত মাত্রা সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে কিছু জানা যায়নি।
গতকাল রোববার দুপুরে শিমুলবাড়ী বিলে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সী মানুষ চাক জাল হাতে মাছ ধরছেন। স্থানীয়রা জানান, উৎসবের সপ্তাহে বিলে চাক জাল ছাড়া অন্য কোনো জাল দিয়ে মাছ ধরা যায় না।
শিমুলবাড়ী গ্রামের সবুর আলী (৫৫) বলেন, ‘প্রায় ৩০ বছর ধরে এই বিলে চাক জাল দিয়ে মাছ ধরছি। প্রতিবছর এ সময় মাছ ধরার উৎসব হয়। কিন্তু গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে আশানুরূপ মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এ বছর পরিস্থিতি আরও খারাপ। রোববার সারা দিনে মাত্র তিন কেজি মাছ পেয়েছি। সাত-আট বছর আগেও একইভাবে মাছ ধরে ২০ কেজির বেশি পেতাম।’
তিনি বলেন, অন্য সময়ে বিলে চায়না দুয়ারি জালের মতো সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল দিয়ে মাছ ধরার কারণে ছোট মাছ ও পোনা ব্যাপকভাবে ধরা পড়ছে। পাশাপাশি ফসলি জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে বিলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও টিকে থাকার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নাওডাঙ্গা গ্রাম থেকে আসা মাছ শিকারি অনিল চন্দ্র রায় (৪৪) জানান, তিনি এক সপ্তাহ ধরে এই বিলে চাক জাল দিয়ে মাছ ধরবেন। রোববার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত আড়াই কেজি মাছ পেয়েছেন। এই বিলে টাকি, শিং, কই, মাগুর, পুঁটি, রুই, কাতলা, শোল ও বোয়ালের মতো বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, ‘প্রতি বছরই চাক জাল দিয়ে মাছ ধরার উৎসবে অংশ নিই। এটি সরকারি বিল। উৎসবের সময় চাক জাল দিয়ে মাছ ধরার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অন্য সময়ে স্থানীয় লোকজন চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে মাছ ধরেন। এতে ছোট মাছও রক্ষা পায় না।’
স্থানীয় হাসেম আলী (৪৫) বলেন, ‘সাত-আট বছর আগে শিমুলবাড়ী বিলে দিনভর মাছ ধরলে ১০–২০ কেজি পর্যন্ত পাওয়া যেত। এখন সাধারণত এক থেকে তিন কেজির বেশি পাওয়া যায় না। গত বছরও কিছুটা মাছ পাওয়া গেলেও এ বছর পরিমাণ আরও কমেছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে দেশি মাছের সংকট আরও বাড়তে পারে।’
তিনি বলেন, কয়েক বছর আগেও বিলটিতে সারা বছর পানি থাকত। কিন্তু গত চার-পাঁচ বছর ধরে শুষ্ক মৌসুমে বিলটি প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে। তখন স্থানীয়রা বিলের জমিতে ফসল চাষ করেন।
তার অভিযোগ, এ সময় ফসল উৎপাদনে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয়।
বিলে মাছ ধরতে আসা মোহর আলী (৫০) বলেন, কয়েক বছর আগেও তিনি সারা বছর শিমুলবাড়ী বিলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন মাছ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন জলাশয়ে ঘুরে মাছ ধরতে হয়।
তার দাবি, পেশাদার মাছ শিকারি হওয়ায় অন্যদের তুলনায় কিছুটা বেশি মাছ পান। তবু আগের মতো মাছ আর পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, শিমুলবাড়ী বিলে চাক জাল দিয়ে মাছ ধরার উৎসব এখনো গ্রামীণ ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। কিন্তু মাছের প্রাচুর্য কমতে থাকলে উৎসবের এই আনন্দ একসময় ম্লান হয়ে যেতে পারে। ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও দেশি মাছের বংশবিস্তার রক্ষার বিষয়টিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম আকন্দ জানান, প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের প্রাচুর্য নির্ভর করে পানির স্থায়িত্ব, প্রজননক্ষেত্র, খাদ্যের প্রাপ্যতা, পানির গুণাগুণ এবং মাছ ধরার চাপের ওপর।
তিনি বলেন, ‘শুষ্ক মৌসুমে জলাশয় শুকিয়ে যাওয়া, মাছের চলাচলের পথ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং ছোট মাছ ও পোনা নির্বিচারে আহরণ করা হলে মাছের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হতে পারে। কৃষিজমি থেকে সার ও কীটনাশকের প্রবাহও জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’
‘শিমুলবাড়ী বিলের মাছ কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে এসব কারণের কোনটি কতটা দায়ী, তা নির্ধারণ করা হয়নি। একইসঙ্গে বিলের প্রাকৃতিক জলাধার ও মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি,’ বলেন তিনি।
