ফেনী রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রাবিরতি দিয়ে ৪৭ জন যাত্রী নিয়ে প্রথমবার পর্যটননগরী কক্সবাজার গেছে মহানগর এক্সপ্রেস। ঢাকা থেকে কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী ট্রেনটির নতুন এ যাত্রাবিরতি ঘিরে ফেনীর যাত্রীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। রাত ১টা ৫০ মিনিটে ফেনী জংশনে পৌঁছানোর পর যাত্রী নিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় ট্রেনটি। প্রথম দিনের যাত্রায় ট্রেনটিতে চড়ে ঢাকা থেকে ফেনী এসেছেন রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব।
এদিকে ফেনী স্টেশনে প্রতিমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে বিএনপির শত শত নেতাকর্মীরা মধ্যরাতে ভিড় জমান। ফেনী রেলওয়ে স্টেশনকে সাজানো হয় নতুন রুপে৷ ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনুসহ বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা প্রতিমন্ত্রীকে ফেনীতে স্বাগত জানান।
ফেনী রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, মহানগর এক্সপ্রেসে ফেনী স্টেশন থেকে যাত্রার জন্য মোট ৬২টি আসন বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামগামী যাত্রীদের জন্য ১৫টি এবং কক্সবাজারগামী যাত্রীদের জন্য ৪৭টি আসন। কক্সবাজারগামী আসনের মধ্যে ১৫টি এসি (স্নিগ্ধা), ৩০টি নন-এসি (শোভন চেয়ার) ও দুটি কেবিনের আসন রয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টায় ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ের স্টেশনের ৩ নম্বর প্লাটফর্ম থেকে ট্রেনটি কক্সবাজারের যাত্রা শুরু করে। ট্রেনটি ট্রেনের লোকোমাস্টার হিসেবে মো. জাহিদুল ইসলাম মিয়া, সহকারী লোকোমাস্টার হিসেবে শাহ আলম ও গার্ড হিসেবে ইমরুল কায়েস রয়েছেন। লোকোমোটিভ রয়েছে ৩০২৯ নম্বর। আর কোচ রয়েছে ১৮টি।
যাত্রা শুরুর আগে প্লাটফর্ম ঘুরে দেখেন এবং যাত্রীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ও প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। এ সময় রেলপথ সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এসময় রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, আপনারা সবাই জানেন, লোকোমোটিভ ও কোচের স্বল্পতা আছে। যার ফলে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে প্রচুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও আমরা পর্যাপ্ত ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা করতে পারছিলাম না। যাত্রীদের সুবিধার্থে মহানগর এক্সপ্রেস নামে একটি ট্রেন আমরা এখন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত চালু করতে যাচ্ছি। আগে দুই জোড়া ট্রেন চলত। এখন আরেক জোড়া যুক্ত হওয়ায় তিন জোড়া ট্রেন চলাচলের সুযোগ হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে ঢাকা-চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় সাত জোড়া ট্রেন চালানোর পর্যায়ে আমরা যেতে চাই। আজ থেকে মহানগর এক্সপ্রেস চালু হওয়া ঢাকা-চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজারের যাত্রীদের জন্য নিশ্চয়ই সুসংবাদ।
এদিকে কক্সবাজারগামী ট্রেনের নতুন এ যাত্রাবিরতি চালুর মাঝেও টিকিট পাওয়া নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগ উঠেছে। অনলাইনে টিকিট ছাড়ার অল্প সময়ের মধ্যেই আর পাওয়া যাচ্ছিল না বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা। এতে নতুন ট্রেন চালুর খবরে আশাবাদী হলেও টিকিট না পেয়ে হতাশ হয়েছেন অনেকে।
আবুল কালাম নামে এক যাত্রী বলেন, ফেনী থেকে সরাসরি ট্রেনে কক্সবাজার যাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়া আমাদের জন্য আনন্দের। এতে খরচ কিছুটা সাশ্রয় হবে। তবে আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় সহজে টিকিট পাওয়া যাবে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
এর আগে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেসের ফেনীতে যাত্রাবিরতির দাবি জানিয়ে আসছিলেন স্থানীয় যাত্রীরা। মহানগর এক্সপ্রেসের রুট সম্প্রসারণের ফলে ফেনী থেকে সরাসরি কক্সবাজার যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় যাত্রীদের চাহিদা কতটা পূরণ হবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের কার্যালয় চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে মহানগর এক্সপ্রেসকে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে চালানোর সিদ্ধান্তের কথা রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্টকে জানায়।
ট্রেনের সূচি অনুযায়ী, মহানগর এক্সপ্রেস রাত সাড়ে ৮টায় ঢাকা থেকে ছেড়ে পরদিন সকাল ৬টায় কক্সবাজার পৌঁছাবে। ফিরতি পথে সকাল ৯টায় কক্সবাজার থেকে ছেড়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ঢাকায় পৌঁছাবে। দুই পথে যাত্রায় সময় লাগবে প্রায় সাড়ে ৯ ঘণ্টা। পথে বিমানবন্দর, নরসিংদী, ভৈরব বাজার, আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, কসবা, কুমিল্লা, লাকসাম, নাঙ্গলকোট ও ফেনী স্টেশনে থামবে ট্রেনটি। নতুন সূচিতে ট্রেনটির আগের নির্ধারিত সীতাকুণ্ডের কুমিরা স্টেশনে যাত্রাবিরতি রাখা হয়নি।
এ ব্যাপারে ফেনী রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. হারুন বলেন, মহানগর এক্সপ্রেসের ফেনী স্টেশনে যাত্রাবিরতি দিয়ে ফেনী থেকে কক্সবাজারগামী ৪৭ জন যাত্রী নিয়ে কক্সবাজার গিয়েছে।
ফেনী থেকে কক্সবাজার যেতে ভাড়ার পরিমাণ
ঢাকা-কক্সবাজার রুটে মহানগর এক্সপ্রেসের ফেনী স্টেশনে যাত্রাবিরতিতে এ পথে সরাসরি ট্রেনে যাতায়াতের সুযোগ পাচ্ছেন স্থানীয় যাত্রীরা। ফেনী থেকে ট্রেনে কক্সবাজার যেতে কত টাকা ভাড়া গুনতে হবে? এসি কিংবা নন-এসি কোন আসনে ভ্রমণে কত খরচ, তা নিয়ে যাত্রীদের আগ্রহ রয়েছে। কক্সবাজারগামী মহানগর এক্সপ্রেসের ফেনী স্টেশনে যাত্রাবিরতি চালুর সঙ্গে সামনে এসেছে ভাড়ার হিসাবও।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, মহানগর এক্সপ্রেসে শোভন চেয়ার (নন-এসি), স্নিগ্ধা (এসি), এসি সিট ও এসি বার্থ শ্রেণির আসন রয়েছে। এসি সিটে বসে এবং এসি বার্থে শুয়ে ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। রোববার সাপ্তাহিক বন্ধ ছাড়া সপ্তাহে ছয় দিন ট্রেনটি চলাচল করবে। ঢাকা থেকে রাত সাড়ে ৮টায় এবং কক্সবাজার থেকে সকাল ৯টায় ট্রেনটি ছেড়ে যাবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজারের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ফেনী থেকে কক্সবাজারের রেলপথের দূরত্ব ৩০৩ কিলোমিটার। এ পথে শোভন চেয়ার শ্রেণিতে ভাড়া ৩৫৫ টাকা, স্নিগ্ধায় ৬৮৫ টাকা এবং এসি বার্থে ১ হাজার ২৭৫ টাকা।
এ ছাড়া ঢাকা থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৫৮৩ কিলোমিটার। এ পথে শোভন চেয়ার শ্রেণিতে ভাড়া ৬৮৫ টাকা, স্নিগ্ধায় ১ হাজার ৩১১ টাকা এবং এসি বার্থে ২ হাজার ৪০৮ টাকা।
নরসিংদী থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৫১৮ কিলোমিটার। এ পথে শোভন চেয়ার, স্নিগ্ধা ও এসি বার্থের ভাড়া যথাক্রমে ৬১০, ১ হাজার ১৬৮ ও ২ হাজার ১৪৩ টাকা। ভৈরববাজার থেকে দূরত্ব ৪৮০ কিলোমিটার। এ পথে তিন শ্রেণির ভাড়া যথাক্রমে ৫৬৫, ১ হাজার ৮১ ও ১ হাজার ৯৮৮ টাকা।
কক্সবাজারের ট্রেনে ফেনীর যাত্রীদের জন্য কত আসন?
সমুদ্র দেখতে কক্সবাজার যেতে এবার ফেনী থেকেই ট্রেনে ওঠার সুযোগ মিলেছে। তবে সেই যাত্রায় আসন পেতে খুব বেশি বিকল্প থাকছে না যাত্রীদের জন্য। ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী মহানগর এক্সপ্রেসে ফেনী স্টেশনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৪৭টি আসন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজারের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে মহানগর এক্সপ্রেসের (৭২২) আসনসংখ্যা ৭০৬টি। আর কক্সবাজার থেকে ঢাকা ফেরার পথে মহানগর এক্সপ্রেসের (৭২১) আসনসংখ্যা ৭৩৬টি।
মহানগর এক্সপ্রেসে শোভন চেয়ার নন-এসি শ্রেণির আসন। স্নিগ্ধা শ্রেণিতে রয়েছে এসি আসন। আর এসি বার্থে শুয়ে ভ্রমণের সুবিধা রয়েছে। তবে দিনের বেলায় বসে ভ্রমণের জন্য এসি আসন এবং রাতের যাত্রায় শোয়ার সুবিধাসহ এসি বার্থের ব্যবস্থা রয়েছে।
ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে ফেনী স্টেশনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৪৭টি আসন। এর মধ্যে এসি বার্থের দুটি, স্নিগ্ধার ১৫টি এবং শোভন চেয়ারের ৩০টি আসন। বাকি আসনগুলো অন্যান্য গন্তব্যের যাত্রীদের জন্য বরাদ্দ থাকবে।
এ পথে চট্টগ্রাম স্টেশনের জন্য বরাদ্দ রয়েছে এসি বার্থের ১০টি, স্নিগ্ধার ১০০টি ও শোভন চেয়ারের ১৫৫টি আসন।
ফেরার পথেও ফেনী ও চট্টগ্রামের যাত্রীদের জন্য আলাদা আসন বরাদ্দ রয়েছে। কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী ট্রেনে ফেনী স্টেশনের জন্য এসি সিটের ছয়টি, স্নিগ্ধার ২০টি ও শোভন চেয়ারের ৪০টি আসন রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে ফিরতি পথে ফেনীর যাত্রীদের জন্য বরাদ্দ ৬৬টি আসন। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টেশনের জন্য রয়েছে এসি সিটের ২১টি, স্নিগ্ধার ৬০টি ও শোভন চেয়ারের ১২৫টি আসন।
