সরকারের উদ্যোগ, বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ গবেষণা এবং প্রান্তিক নারী কারিগরদের দক্ষতায় আবারও ফিরে এসেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন। একসময় বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ‘বোনা বাতাস’ বা ‘হাওয়াই কাপড়’ নামে পরিচিত এই মসলিন এখন বাণিজ্যিক উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
অতিসূক্ষ্ম সুতা, স্বচ্ছতা ও অসাধারণ বুননশৈলীর জন্য ঢাকাই মসলিনের খ্যাতি ছিল বিশ্বজুড়ে। রোমান, গ্রিক ও আরব সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে মুঘল দরবার পর্যন্ত এর চাহিদা ছিল ব্যাপক। মসলিনের বিশেষ সংস্করণ ‘মলমল খাস’ সম্রাটদের পোশাক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কাপড়ের গুণগত মান ও নকশার ভিত্তিতে এর বিভিন্ন নামও ছিল, যার মধ্যে ‘আবে-রওয়ান’ ও ‘শবনম’ উল্লেখযোগ্য।
তবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে যন্ত্রে তৈরি সস্তা কাপড়ের প্রতিযোগিতা, দেশীয় তাঁতশিল্পের সংকট এবং মসলিন তৈরির বিশেষ কাঁচামাল ফুটি কার্পাসের বিলুপ্তির কারণে এ শিল্প ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
ঢাকাই মসলিন পুনরুদ্ধারে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড গবেষণাভিত্তিক উদ্যোগ নেয়। ঐতিহাসিক নথি, পুরোনো নমুনা ও তুলার বিভিন্ন জাত নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে মসলিন তৈরির উপযোগী ফুটি কার্পাস শনাক্ত ও পুনরায় চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
গবেষকেরা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বন্য তুলার ৩৯টি জাত সংগ্রহ করেন। পরে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত পুরোনো মসলিনের নমুনার সঙ্গে সংগৃহীত তুলার ডিএনএ ও জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট গবেষণার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
মসলিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ যন্ত্রপাতিও নতুন করে তৈরি করতে হয়েছে। তুলা সংগ্রহ, আঁশ পরিষ্কার, অতিসূক্ষ্ম সুতা কাটা, সুতা প্রস্তুত এবং তাঁতে বুননসহ একাধিক জটিল ধাপ পেরিয়ে তৈরি হয় এই কাপড়।
পুনরুজ্জীবিত মসলিনের সুতার কাউন্ট ৭৩১ থেকে ৭৫০ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতার এই সূক্ষ্মতাই মসলিনের স্বচ্ছতা ও হালকা বুননের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকাই মসলিন বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর ফলে ঐতিহ্যবাহী এই পণ্যের স্বতন্ত্র পরিচিতি আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
মসলিন পুনরুদ্ধার প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান। প্রকল্পের আওতায় ৩০০-এর বেশি প্রান্তিক নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সূক্ষ্ম সুতা কাটার কাজে দক্ষ করে তোলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে জানানো হয়েছে।
মসলিনের সুতা তৈরি অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতার মতো প্রাকৃতিক পরিবেশও এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে সুতা যাতে সহজে ছিঁড়ে না যায়, সে জন্য উপযুক্ত পরিবেশে সুতা কাটতে হয়।
একটি মসলিন শাড়ি বুনতে দুই থেকে চারজন তাঁতির কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। ফলে এ শিল্পে দক্ষ কারিগরদের শ্রম, অভিজ্ঞতা ও কারুশিল্পের বিশেষ মূল্য রয়েছে।
প্রথম পর্যায়ের গবেষণা ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের পর সরকার দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ পর্যায়ে ফুটি কার্পাসের উৎপাদন বাড়ানো, মসলিন তৈরির প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবোতে নির্মিত ‘ঢাকাই মসলিন হাউস’ এ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি কাপাসিয়া, রাজশাহী ও কুমিল্লার কৃষকদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সরবরাহ বাড়ানো যায়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্যমতে, প্রাথমিক পর্যায়ে একটি মসলিন শাড়ি তৈরির খরচ প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা হতে পারে। উৎপাদন বাড়ানো এবং কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে এ ব্যয় কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পুনরুজ্জীবিত ঢাকাই মসলিন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জাপানের মতো দেশের বিলাসবহুল ফ্যাশন বাজারে আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ৫০০ গজ মসলিন কাপড়ের একটি অর্ডার সম্পন্ন হওয়ার তথ্যও দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মসলিনের উৎপাদনব্যয় বেশি হওয়ায় এটি সাধারণ পোশাকের বাজারের পরিবর্তে উচ্চমূল্যের বিলাসবহুল পণ্যের বাজারে জায়গা করে নিতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরির জন্য পণ্যের মান বজায় রাখা, নিয়মিত কাঁচামাল সরবরাহ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিপণনব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত মূলত বৃহৎ পরিসরে উৎপাদিত পোশাকের জন্য পরিচিত। ঢাকাই মসলিন সেই পরিচিতির বাইরে দেশের ঐতিহ্যভিত্তিক উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে এ শিল্পের সম্প্রসারণ গ্রামীণ কর্মসংস্থান, নারী কারিগরদের আয় বৃদ্ধি এবং ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্প সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায় পুনরুদ্ধার করা ঢাকাই মসলিনকে টেকসই বাণিজ্যিক শিল্পে রূপ দিতে পারলে তা বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
The post ‘সরকারি উদ্যোগে’ বিশ্ববাজারে ডানা মেলতে প্রস্তুত ঢাকাই মসলিন appeared first on ভোরের চেতনা.
