Published on
:
3 min read
‘মাইলস টু গো...’, ২৮ বছর ধরে পথের ক্লান্তি ভুলে হেঁটে চলেছেন কার্ল বুশবি। তবুও এখনও পৌঁছননি তাঁর বাড়িতে। ২৮ বছর ধরে নিজের বাড়ির ঠিকানাকে পাখির চোখ করে অভিনব অভিযানে নেমেছেন এই ব্রিটিশ অভিযাত্রী।
বাবার দেওয়া একটি জন্মদিনের কার্ড থেকে নিজের জীবনের একটি লক্ষ্য স্থির করেছিলেন ব্রিটিশ যুবক। সেই লক্ষ্যপূরণে ১৯৯৮ সালে চিলি থেকে ইংল্যান্ডের বাড়ির উদ্দেশে হাঁটা শুরু করেন কার্ল বুশবি। চার মহাদেশ, ২৯টি দেশ, দুর্ভেদ্য জঙ্গল, বরফে ঢাকা সমুদ্র পেরিয়ে অবশেষে ২৮ বছর পরে তিনি পৌঁছেছেন তাঁর দেশ ব্রিটেনে। তবে এখনও বাড়ি পৌঁছতে এখনও বাকি প্রায় ৪০০ কিলোমিটার। তবে এই দুঃসাহসিক অভিযানের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে তাঁর পরিবারকে।
এক নজরে
১৯৯৮ সালে চিলি থেকে ইংল্যান্ডের উদ্দেশে হাঁটা শুরু করেন কার্ল বুশবি।
২৮ বছরের অভিযানে পেরিয়েছেন চার মহাদেশ ও ২৯টি দেশ।
দারিয়েন গ্যাপের দুর্গম জঙ্গল থেকে বেরিং প্রণালীর বরফ—পথে ছিল একাধিক বিপজ্জনক বাধা।
দীর্ঘ অভিযানে তাঁর ছেলের বয়স ৮ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৬ বছর।
২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ডোভারের কাছে পৌঁছন কার্ল।
ইংল্যান্ডের হালে মায়ের বাড়িতে পৌঁছতে এখনও বাকি প্রায় ৪০০ কিলোমিটার।
১৯৯৮ সালের ১ নভেম্বর চিলির পুন্তা আরেনাস থেকে পায়ে হেঁটে ব্রিটেনের বাড়ির ঠিকানার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন তিনি। তখন কি জানতেন, বাড়ি ফেরার এই পথ পেরোতে লেগে যাবে প্রায় তিন দশক?
২০২৬ সালের অক্টোবর। ২৮ বছর পরে অবশেষে ব্রিটেনের মাটিতে পা রেখেছেন কার্ল। কিন্তু গন্তব্য এখনও বহু দূর। ডোভার থেকে হাল পর্যন্ত পৌঁছতে এখনও হাঁটতে হবে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার। দীর্ঘ এই পথের শেষে অপেক্ষা করছেন তাঁর মা। কার্লের আশা, ১ নভেম্বরের আশপাশেই শেষ করতে পারবেন এই যাত্রা—যে তারিখে ১৯৯৮ সালে শুরু হয়েছিল তাঁর অভিযান।
বাবার দেওয়া জন্মদিনের কার্ড থেকে স্বপ্ন
কার্লের অভিযানের ভাবনা এসেছিল বাবার দেওয়া একটি জন্মদিনের কার্ড থেকে। তাঁর বাবা সেই কার্ডে লিখেছিলেন ব্রিটিশ বিশেষ বাহিনীর দুই সদস্যের একটি আলোচনা। তাঁরা তর্ক করছিলেন বেরিং প্রণালী পেরিয়ে পায়ে হেঁটে লন্ডন থেকে নিউ ইয়র্কে যাওয়া আদৌ সম্ভব কি না। সেই ভাবনাই নাড়া দিয়েছিল কার্লকে। তবে শুধু সেই পথ পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখেননি তিনি। ঠিক করলেন, দক্ষিণ আমেরিকার একেবারে দক্ষিণ প্রান্ত থেকে হাঁটা শুরু করে নিজের শহর ইংল্যান্ডের হালে পৌঁছবেন। কার্ল এই অভিযানের নাম দেন ‘গোলিয়াথ এক্সপেডিশন’। শর্ত ছিল, কোনও যানবাহনে চড়ে পথ পেরোবেন না, বাড়ি ফেরার আগে কোনও ভাবেই নিজের অভিযান থামাবেন না। যেমন ভাবা, তেমন কাজ। কয়েকশো ডলার সঙ্গে নিয়ে শুরু হয়েছিল পথচলা। সেই পথে ২৮ বছরে পেরিয়েছেন চার মহাদেশ ও ২৯টি দেশ।
কখনও দুর্ভেদ্য জঙ্গল, কখনও বরফের সমুদ্র
শুরু থেকেই সহজ ছিল না কার্লের পথ। ২০০০ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে তাঁকে পেরোতে হয় পানামা ও কলম্বিয়ার মাঝের দুর্ভেদ্য দারিয়েন গ্যাপ। ঘন জঙ্গল, পথের অভাব, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষ এবং মাদক কারবারিদের দাপট—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি তখন ছিল বিপজ্জনক। কার্ল পরে এই অংশকে তাঁর অভিযানের অন্যতম কঠিন অধ্যায় বলে বর্ণনা করেছেন।
এর পরেও অপেক্ষা করছিল আরও বড় পরীক্ষা। ২০০৬ সালে আলাস্কা থেকে রাশিয়ার দিকে বেরিং প্রণালী পেরোনোর সময় বরফের উপর দিয়ে প্রায় ৫৮ মাইল পথ অতিক্রম করতে হয় তাঁকে। সময় লেগেছিল ১৪ দিন। পায়ের নীচে জমাট বরফ, চারপাশে হিমশীতল জল, আর যে কোনও মুহূর্তে বরফ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কার দোসর ছিল মেরুভালুকের হামলার ভয়। কার্লের কথায়, এই অংশটাই ছিল গোটা অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন পরীক্ষা।
শুধু প্রাকৃতিক বাধাই নয়, বিরূপ ছিল পরিস্থিতিও
২০০৭-০৮ সালের আর্থিক মন্দার জেরে অভিযানের জন্য পাওয়া আর্থিক সহায়তা আসা কমে যায়। পরে রাশিয়াও কার্লকে ভিসা দিতে অস্বীকার করে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে দেশ থেকে ফেরত পাঠানো হয়। মহামারির সময়ও দীর্ঘ বিরতি নিতে হয়েছিল। কিন্তু কোনও বাধাতেই শেষ পর্যন্ত অভিযানে দাঁড়ি ফেলতে পারেনি। পথ বদলেছেন, অপেক্ষা করেছেন, আবার নতুন করে হাঁটা শুরু করেছেন অদম্য ব্রিটিশ তরুণ। ২০২৪ সালে ইউরোপে পৌঁছনোর স্থলপথ কঠিন হয়ে পড়লে কাজাখস্তান থেকে আজারবাইজানের দিকে কাস্পিয়ান সাগর সাঁতরে পেরোনোর মতো দুঃসাহসিক পথও বেছে নেন কার্ল। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, এতদিনে হেঁটে ফেলেছেন ৫০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি রাস্তা।
৮ বছরের ছেলে এখন ৩৬
এই অভিযানের সবচেয়ে বড় সমস্যা, পথের বিপদ নয় বরং পরিবার থেকে দূরে থাকার যন্ত্রণা। যাত্রা শুরুর সময় কার্লের ছেলের বয়স ছিল মাত্র আট বছর। আজ সে ৩৬ বছরের যুবক। এত বছরে মা ও ছেলের সঙ্গে কার্লের দেখা হয়েছে হাতে গোনা কয়েক বার। এমনকী, নিজের নাতনির সঙ্গেও এখনও সামনাসামনি দেখা হয়নি তাঁর।
‘ঘরে ফেরার গান’ আটকে শেষ ৪০০ কিমিতে
৫ অক্টোবর, ২০২৬-এ ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরে ডোভারের কাছে পৌঁছন কার্ল। চ্যানেল টানেল দিয়ে হাঁটার অনুমতি না মেলায় সমুদ্র পেরোনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। এখন সামনে শেষ কয়েকশো কিলোমিটার। কিন্তু এই দূরত্ব শুধু পায়ের মাপে মাপা যায় না। ২৮ বছরের অপেক্ষা, ফেলে আসা সময় আর পরিবারের কাছে ফেরার আকাঙ্ক্ষা কার্লের প্রতিটি পদক্ষেপের ভার আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
কার্ল জানেন, বাড়ির দরজায় পৌঁছনোতেই তাঁর মিশন শেষ নয়। এখন সেই মিশনের জন্য প্রিয়জনদের অপেক্ষার মূল্যও দিতে হবে তাঁকে। চিনে নিতে তবু নিজের বাড়ির দরজায় পৌঁছনোর স্বপ্ন তাঁকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। ১৯৯৮ সালে শুরু হওয়া তিন দশক দীর্ঘ যাত্রার শেষ ধাপে ‘ঘরে ফেরার গান’-ই এখন কার্লের সব এনার্জির উৎস। প্রিয়জনের কাছে পৌঁছনোর গল্পের শেষ পাতায় নজির গড়তে চলেছেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী কার্ল বুশবি।
