মোঃ মাসুদ আলম সাগর
সাংবাদিককে বলা হয় জাতির বিবেক। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমের দায়িত্বও তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাংবাদিকতার এই মর্যাদা শুধু একটি প্রেস কার্ড, পরিচয়পত্র কিংবা কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে যুক্ত থাকলেই অর্জিত হয় না। সাংবাদিকতা একটি দায়িত্ব, একটি অঙ্গীকার এবং সর্বোপরি মানুষের আস্থার জায়গা।
একজন মানুষের গলায় প্রেস কার্ড ঝুলতে পারে, হাতে ক্যামেরা থাকতে পারে, কোনো পত্রিকা, টেলিভিশন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল কিংবা সংবাদ সংস্থার পরিচয় বহন করতে পারেন। কিন্তু প্রকৃত প্রশ্ন হলো—তিনি কতটা নিরপেক্ষ, কতটা তথ্যনির্ভর, কতটা অনুসন্ধিৎসু এবং সত্য প্রকাশে কতটা সাহসী? তিনি কি ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেন? এসব প্রশ্নের উত্তরই একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে।
ইংরেজি JOURNALIST শব্দটির ১০টি অক্ষরকে একজন আদর্শ সাংবাদিকের ১০টি গুণের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করলে সাংবাদিকতার একটি চমৎকার আত্মমূল্যায়নের কাঠামো দাঁড় করানো যায়। প্রতিটি গুণের জন্য ১০ নম্বর ধরে মোট ১০০ নম্বরের একটি পরীক্ষা। তবে এই পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এখানে পরীক্ষক অন্য কেউ নন, পরীক্ষার্থী নিজেই।
J—Journaling: অর্থাৎ ঘটনা ও তথ্য লিপিবদ্ধ করা। সাংবাদিকতার শুরুই হয় তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে। একটি ঘটনা শুনে বা কারও বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে সংবাদ লিখে দেওয়া সাংবাদিকতা নয়। সময়, স্থান, ব্যক্তি, ঘটনা, বক্তব্য, নথি—সবকিছু সংগ্রহ ও যাচাই করতে হয়। প্রযুক্তির এই যুগে তথ্য সংরক্ষণের সুযোগ অনেক বেড়েছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কতটা নিয়মিত তথ্য নথিবদ্ধ করি এবং পুরোনো তথ্যের সঙ্গে নতুন তথ্য মিলিয়ে দেখি?
O—Objective: অর্থাৎ বস্তুনিষ্ঠতা। সাংবাদিকের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ থাকতে পারে, কিন্তু সংবাদে ব্যক্তিগত পক্ষপাতের স্থান নেই। কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা বিরূপতা যেন প্রতিবেদনের তথ্য ও ভাষাকে প্রভাবিত না করে, সেটিই পেশাদারিত্ব। সত্যের পক্ষে থাকা সাংবাদিকের দায়িত্ব; কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের পক্ষে নয়।
U—Unbiased: অর্থাৎ পক্ষপাতহীনতা। শুধু দুই পক্ষের বক্তব্য নেওয়াই পক্ষপাতহীনতা নয়; নিজের মনকেও পূর্বধারণা থেকে মুক্ত রাখতে হয়। অভিযোগের সংবাদে অভিযোগকারী যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অভিযুক্তের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ। আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে প্রমাণ খোঁজা সাংবাদিকতার জন্য বিপজ্জনক।
R—Responsible: অর্থাৎ দায়িত্বশীলতা। একজন সাংবাদিকের একটি বাক্য বা একটি শিরোনাম সমাজে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। ভুল তথ্য, যাচাইহীন গুজব, অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য কিংবা উত্তেজনাকর ভাষা মানুষের ক্ষতি করতে পারে। তাই সংবাদ প্রকাশের আগে এর সম্ভাব্য সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি। সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়িত্বশীলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
N—Notable: অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য বিষয় নির্বাচন করার দক্ষতা। প্রতিদিন অসংখ্য ঘটনা ঘটে; সবকিছু সংবাদ নয়। একজন সাংবাদিককে বুঝতে হয় কোন তথ্য মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রকল্পে অনিয়ম, হাসপাতালের চিকিৎসক সংকট, সরকারি সেবায় জনবল ঘাটতি কিংবা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা কোনো সমস্যা—এসব জনস্বার্থের সংবাদ। সংবাদ নির্বাচনে সাংবাদিকের বিচারবোধ তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
A—Accurate: অর্থাৎ নির্ভুলতা। সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো তথ্যের সঠিকতা। একটি নাম, সংখ্যা, পদবি, সময় বা স্থানের সামান্য ভুলও পুরো প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে পারে। বিশেষ করে অভিযোগভিত্তিক সংবাদে যাচাই আরও গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই ‘আগে প্রকাশ, পরে যাচাই’ নয়—সাংবাদিকতার মূলনীতি হওয়া উচিত, দ্রুত হওয়ার চেয়ে সঠিক হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
L—Logician: অর্থাৎ যৌক্তিক চিন্তা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা। সাংবাদিক শুধু তথ্য সংগ্রহ করেন না; তথ্যের মধ্যে সম্পর্কও খুঁজে বের করেন। কোনো ঘটনা কেন ঘটল, এর পেছনে কী কারণ, কারা ক্ষতিগ্রস্ত হলো, পূর্বের ঘটনার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা সাংবাদিকতার গভীরতা বাড়ায়। শুধু বক্তব্যের সংকলন নয়, তথ্যের যৌক্তিক বিশ্লেষণই একটি প্রতিবেদনকে শক্তিশালী করে।
I—Inquisitive: অর্থাৎ অনুসন্ধিৎসু হওয়া। সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় শক্তি তার প্রশ্ন করার ক্ষমতা। ‘কেন’, ‘কীভাবে’, ‘কার জন্য’, ‘কোথায়’, ‘কত টাকা’, ‘নথি কোথায়’, ‘এর আগে কী হয়েছিল’—এসব প্রশ্ন থেকেই অনুসন্ধানের শুরু। যে সাংবাদিক প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেন, তার সাংবাদিকতাও একসময় থেমে যায়।
S—Sincere: অর্থাৎ আন্তরিকতা। সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক গুণ হলো কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও সততা। মানুষের সমস্যা যেন শুধু একটি ‘কনটেন্ট’ না হয়ে ওঠে। একজন সাংবাদিকের প্রতিবেদন মানুষের কথা বলবে, জনস্বার্থকে সামনে আনবে এবং সমস্যার সমাধানের পথ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে—এটাই হওয়া উচিত তার পেশাগত আন্তরিকতা।
T—Truthful: অর্থাৎ সত্যবাদিতা ও সত্যের প্রতি অঙ্গীকার। সাংবাদিকতার সব গুণের শেষ ঠিকানা সত্য। ক্ষমতাবান কারও অসন্তুষ্টি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা, বিজ্ঞাপন হারানোর ভয় কিংবা অন্য কোনো চাপ—কোনোটিই যেন সত্যের জায়গায় আপসের কারণ না হয়। তবে সত্য প্রকাশের অর্থ যাচাইহীন অভিযোগ প্রকাশ নয়। তথ্য, নথি, প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতেই সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে হয়।
সাংবাদিকতার সঙ্গে NEWS শব্দটির একটি চমৎকার সম্পর্কও রয়েছে। N—North, E—East, W—West, S—South—চার দিকের প্রথম অক্ষর থেকেই NEWS। অর্থাৎ সংবাদ যেন চারদিকের খবর ধারণ করে। কিন্তু একজন প্রকৃত সাংবাদিকের কাজ শুধু চার দিকের খবর জানা নয়; তাকে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা স্তর, নানা দৃষ্টিভঙ্গি ও নানা প্রান্তের মানুষের কথাও জানতে হয়। অর্থাৎ সাংবাদিকতাকে হতে হয় বহুমাত্রিক ও সর্বদিকমুখী।
একটি সংবাদ তৈরির ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত 5W1H—Who, What, When, Where, Why এবং How—অর্থাৎ কে, কী, কখন, কোথায়, কেন এবং কীভাবে—এই ছয়টি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। একটি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সাংবাদিককে জানতে হয়।
একই সঙ্গে সংবাদ লেখার ক্ষেত্রে উল্টো পিরামিড কাঠামো অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আগে, এরপর অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পর্যায়ক্রমে উপস্থাপন করা। এতে পাঠক দ্রুত মূল বিষয়টি বুঝতে পারেন। অভিযোগের সংবাদে সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যও তুলে ধরা উচিত। তবে কোনো পক্ষের বক্তব্য পাওয়া না গেলে, সে বিষয়টিও দায়িত্বশীল ভাষায় উল্লেখ করা যেতে পারে।
বর্তমানে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কেউ বক্তব্য দিতে অনিচ্ছুক হলে তাকে জোর করে বক্তব্য দেওয়ানো যায় না। কেউ ফোন না ধরলে বা সাক্ষাৎ করতে অপারগ হলে, যথাযথ চেষ্টা করার পর প্রাপ্ত তথ্য ও নথির ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ করা যেতে পারে। তবে ভাষা হতে হবে সংযত, তথ্যনির্ভর ও শালীন। রাগ, ক্ষোভ কিংবা ব্যক্তিগত আক্রোশ সংবাদে প্রকাশ করা কোনোভাবেই পেশাদার সাংবাদিকতার অংশ নয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আমরা কি নিজেরাও এই মানদণ্ডে নিজেদের বিচার করি?
অন্য সাংবাদিকের ভুল ধরতে আমরা খুব সহজেই পারি। কে পক্ষপাতদুষ্ট, কে যাচাই না করে সংবাদ করেছেন, কে ব্যক্তিগত স্বার্থে সংবাদ করেছেন—এসব নিয়ে আলোচনা করতে আমাদের সময় লাগে না। কিন্তু নিজের সংবাদ, নিজের আচরণ, নিজের পক্ষপাত, নিজের ভুল এবং নিজের পেশাগত সীমাবদ্ধতার দিকে তাকাতে আমরা কতটা সাহসী?
সাংবাদিকতার প্রকৃত উন্নতি শুরু হবে তখনই, যখন আমরা অন্যকে বিচার করার আগে নিজেদের বিচার করতে শিখব।
যদি JOURNALIST-এর ১০টি গুণকে ১০০ নম্বরের পরীক্ষা ধরা হয়, তাহলে প্রত্যেক সাংবাদিকের উচিত নিজেকে প্রশ্ন করা—আমি কত নম্বর পাওয়ার যোগ্য? ৯০ পেলে আত্মতুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই; বাকি ১০ নম্বর অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। ৭০ পেলে ঘাটতি পূরণ করতে হবে। ৫০ পেলে নতুন করে শেখার সময় এসেছে। আর খুব কম নম্বর পেলে শুধু পরিচয়পত্র বহন না করে নিজের সাংবাদিকতাকে নতুন করে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
কারণ প্রেস কার্ড সাংবাদিকতার পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে পারে না। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয় সততা, নিরপেক্ষতা, দক্ষতা, অনুসন্ধিৎসা, দায়িত্ববোধ ও সত্যের প্রতি অঙ্গীকারের মাধ্যমে।
একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার প্রেস কার্ড নয়—বিশ্বাসযোগ্যতা।
সবচেয়ে বড় শক্তি তার পদবি নয়—তথ্য।
সবচেয়ে বড় সম্পদ তার পরিচিতি নয়—সততা।
আর সবচেয়ে বড় অস্ত্র শুধু ক্যামেরা বা কলম নয়—তার বিবেক।
পরিচয়পত্র একজন মানুষকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে, কিন্তু তার কাজই প্রমাণ করে তিনি সত্যিকার অর্থে সাংবাদিক কি না। কার্ডের মেয়াদ শেষ হতে পারে, প্রতিষ্ঠান বদলাতে পারে, পদবি বদলাতে পারে; কিন্তু একজন সৎ সাংবাদিকের কর্ম ও বিশ্বাসযোগ্যতা মানুষের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে।
তাই অন্যের নম্বর দেওয়ার আগে আসুন, নিজের খাতা খুলে বসি। নিজেকেই প্রশ্ন করি—JOURNALIST-এর ১০টি গুণের মধ্যে আমি কতটি সত্যিকার অর্থে ধারণ করি?
এই আত্মজিজ্ঞাসার উত্তরই হয়তো বলে দেবে—আমরা শুধু পরিচয়পত্রধারী, নাকি সত্যিকার অর্থেই সাংবাদিক।
