Published on
:
2 min read
স্মিতা বাজোরিয়া—ডিরেক্টর গ্যাঞ্জেস আর্ট গ্যালারি
‘ভারতীয় আধুনিক শিল্পের ইতিহাসে যোগেন চৌধুরী এক অনন্য ও স্বতন্ত্র শিল্পীসত্তার নাম। তাঁর শিল্পে যেমন রয়েছে গভীর পর্যবেক্ষণ, তেমনই রয়েছে মানুষের জীবন, সমাজ, সম্পর্ক ও অস্তিত্বকে দেখার এক নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর বিখ্যাত ক্রস-হ্যাচিং বা সূক্ষ্ম রেখার ব্যবহারে গড়ে ওঠা অবয়বগুলি ভারতীয় চিত্রকলায় তাঁকে একটি স্বতন্ত্র ভাষা নির্মাণের সুযোগ দিয়েছে। তাঁর নারী-পুরুষের অবয়ব, মানুষ ও প্রকৃতি, প্রাণী এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা অনুষঙ্গ কখনও বাস্তব, কখনও ব্যঙ্গাত্মক, আবার কখনও গভীর প্রতীকী অর্থ বহন করে।
যোগেন চৌধুরীর অবদান শুধু তাঁর অসামান্য সৃষ্টিকর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একজন শিল্পশিক্ষক, চিন্তাশীল শিল্প-ব্যক্তিত্ব এবং অসংখ্য নবীন শিল্পীর কাছে একজন পথপ্রদর্শক। দীর্ঘ শিল্পজীবনে তিনি বহু তরুণ শিল্পীর প্রতিভা ও সম্ভাবনাকে চিনেছেন এবং তাঁদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য নিজের অভিজ্ঞতা, সময় ও পরামর্শ উজাড় করে দিয়েছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি একজন শিল্পীর আত্মবিশ্বাস, নিজস্ব ভাষা এবং শিল্পচর্চার স্বাধীনতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর কাজ ও কথায় তারই প্রতিফলন দেখা যায়।
অগণিত ছাত্র ও নবীন শিল্পীর পাশে তিনি যে আন্তরিকতার সঙ্গে দাঁড়িয়েছেন, তা তাঁকে শুধুমাত্র একজন বিশিষ্ট শিল্পী নয়, একজন মানবিক শিক্ষক হিসেবেও বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। তাঁর কাছে শিল্পচর্চা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের পথ নয়, পরবর্তী প্রজন্মের হাতে শিল্পের উত্তরাধিকার তুলে দেওয়াও তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
নব্বইয়ের দশকে, যখন যোগেন চৌধুরীর শিল্পকর্ম জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, তখন তাঁর আঁকা দু’টি চিত্র সংগ্রহ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। বর্তমানে, সেই দু’টি নিদর্শন মিউজ়িয়াম পিস হিসেবে সংরক্ষিত। বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল গ্যালারি অফ মডার্ন আর্টে যোগেন চৌধুরীর প্রদর্শনীতে সেই দু’টি ছবি স্থান পেয়েছিল।
যোগেন চৌধুরীর সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গ্যাঞ্জেস আর্ট গ্যালারির লোগো ওঁর সৃষ্টি করা। এই আন্তর্জাতিক মানের লোগো দেখলেই বোঝা যায় যে যোগেন চৌধুরী তাঁর বিখ্যাত সিনুয়াস লাইনের শিল্পকলায় কতটা অনন্য ছিলেন। গ্যাঞ্জেস আর্ট গ্যালারিতে তিনি দু’টি শো করেন, এবং একটি শো তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করেন। আমাদের চিত্রশালার একাধিক গ্রুপ শোতেও তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন।
বিদেশের বিভিন্ন আর্ট গ্যালারির মতো আমাদেরও একটি মিউজ়িয়াম শপ রয়েছে এবং এই সম্বন্ধিত বিষয়েও যোগেনদা ভীষণ আগ্রহী ছিলেন। তাঁর চিত্রিত ২৫-৩০টি ছবি ব্যবহার করার অনুমতি তিনি আমাদের দিয়েছিলেন, যাতে আমাদের শপের পোস্টার, ম্যাট, টেবিল ম্যাটের মতো দৈনন্দিন আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রের মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষের ঘরে সেগুলি পৌঁছে যেতে পারে।
আমাদের অত্যন্ত সৌভাগ্য যে আজ থেকে দু’বছর আগে গ্যাঞ্জেস আর্ট গ্যালারির পক্ষ থেকে যোগেন চৌধুরীকে ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ দিয়ে সম্মান জ্ঞাপন করতে সক্ষম হয়েছিলাম। যোগেন চৌধুরীর শিল্প তাই শুধু ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর শিল্পভাবনা, শিক্ষা ও মানুষের প্রতি তাঁর উদারতা ভারতীয় শিল্পের আগামী প্রজন্মকেও দীর্ঘদিন প্রভাবিত করবে।’
অনুলিখন: শুভম গঙ্গোপাধ্যায়