মোঃ জয়নাল আবেদীন টুক্কু, রামু থেকে ফিরে :
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে কক্সবাজারের রামুতে বাঁকখালী নদীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব। সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলার বাঁকখালী নদীর পূর্ব রাজারকুল ঘাট এলাকায় বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির মেলবন্ধনে উৎসবটি পরিণত হয় বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষের মিলনমেলায়। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শত শত নারী-পুরুষ উৎসবে অংশ নেন।
‘সাম্প্রদায়িকতার জাহাজে, ফানুসের আলোয় দূর হোক সাম্প্রদায়িক অন্ধকার’ স্লোগানকে সামনে রেখে আয়োজিত এ উৎসবে বাঁশ, বেত, কাঠ ও রঙিন কাগজ দিয়ে তৈরি দৃষ্টিনন্দন কল্পজাহাজ বাঁকখালী নদীতে ভাসানো হয়। বৌদ্ধ প্যাগোডা ও জাদির আদলে নির্মিত এসব জাহাজে ফুটিয়ে তোলা হয় বৌদ্ধ ভাস্কর্য, হাঁস, পক্ষীরাজ ঘোড়া, নাগরাজ, ড্রাগন, হাতি, সিংহ, হরিণ ও বিহার-মন্দিরের প্রতিকৃতি।
জাহাজগুলোতে বৌদ্ধ কীর্তন, ঢোল, কাঁসর ও মন্দিরার তালে তালে শিশু-কিশোর ও তরুণদের নাচ-গান উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলে। নদীর দুই তীরে দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
স্থানীয়দের মতে, শত বছরের পুরোনো এ আয়োজন রামুর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উজ্জ্বল নিদর্শন। উৎসবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় নিরাপত্তাব্যবস্থা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ খৈরম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে কিছু দুষ্কৃতকারী মাঝে মাঝে অপচেষ্টা চালায়। সরকার এসব অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করে আসছে।
তিনি আরও বলেন, “আমরা যে ধর্মের অনুসারীই হই না কেন, যুগ যুগ ধরে একসঙ্গে বসবাস করছি। আজকের কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এখানে সব ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের মানুষ একত্রিত হয়ে আনন্দ উদ্যাপন করছেন।”
প্রতিমন্ত্রী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। পারস্পরিক মেলবন্ধন ও সম্প্রীতি নষ্ট করতে একটি কুচক্রী মহল তৎপর রয়েছে উল্লেখ করে তিনি সবাইকে সজাগ থাকার এবং ঐক্যবদ্ধভাবে তা প্রতিরোধ করার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব লুৎফুর রহমান কাজল।
রামুর কেন্দ্রীয় প্রবারণা ও জাহাজ ভাসা উৎসব উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি বিপ্লব বড়ুয়ার সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক দয়াল বড়ুয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আশীর্বাদক ছিলেন রামু মৈত্রী বিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত বিজয় রক্ষিত মহাথের।
উৎসবের উদ্বোধক ছিলেন একুশে ও স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. সুকোমল বড়ুয়া।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আঃ মন্নান, পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমান, রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান, এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী সম্পাদক শহিদুল আজম, রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ.কে. ফজলুল হক এবং বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি কক্সবাজার জেলার সাধারণ সম্পাদক সুজন বড়ুয়া।
এ ছাড়া গুণীজন সম্মাননায় সংবর্ধিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাথি উদয় কুসুম বড়ুয়াসহ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন রামুর কেন্দ্রীয় প্রবারণা ও জাহাজ ভাসা উৎসব উদ্যাপন পরিষদের সমন্বয়ক অর্ণব বড়ুয়া।
The post রামুর ঐতিহ্যবাহী উৎসবে সম্প্রীতির বার্তা দিলেন প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ খৈরম appeared first on sokalerkhobor24.com.
