পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করার বক্তব্য প্রত্যাহার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে সরকারের স্পষ্ট অবস্থান ঘোষণার দাবি জানিয়েছে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সংগঠন মায়ের ডাক। সংগঠনটির মতে, অপরাধ দমনের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার কোনো বৈধতা নেই। এ ধরনের বক্তব্য আইনের শাসন, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রের জবাবদিহির জন্য গুরুতর হুমকি।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ ও নিন্দা জানায় সংগঠনটি।
বিবৃতিতে বলা হয়, দীর্ঘ ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে বাংলাদেশে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিপীড়নের শিকার হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। এসব ঘটনার পর হাজারো পরিবার এখনো স্বজনের সন্ধান, সত্য উদ্ঘাটন ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার যন্ত্রণা তাদের কাছে কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়, বরং জীবনের নির্মম বাস্তবতা।
এমন ইতিহাসের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে ক্রসফায়ার করার বক্তব্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে মায়ের ডাক। সংগঠনটির মতে, এ বক্তব্য বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রতি সম্মতি বা বৈধতার ইঙ্গিত বহন করলে তা আইনের শাসন, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রের জবাবদিহির জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত হলেই তাঁর জীবনের অধিকার ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার বিলুপ্ত হয়ে যায় না। অপরাধের অভিযোগের তদন্ত হতে হবে আইনসম্মত ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় এবং বিচার করতে হবে স্বাধীন আদালতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব মানুষের জীবন রক্ষা করা, বিচারবহির্ভূতভাবে সেই জীবন কেড়ে নেওয়া নয়।
সংগঠনটি বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে জানায়, এসব অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনেও জীবনের অধিকার ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে। তাই অপরাধ দমনের বিকল্প হিসেবে ক্রসফায়ারকে উপস্থাপন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বিচারবহির্ভূত হত্যার পরিণতি শুধু একজন মানুষের জীবনহানিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার কতটা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তা গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলো জানে। বাংলাদেশের আর কোনো পরিবারকে যেন এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।
বিবৃতিতে মায়ের ডাক চার দফা দাবি জানিয়েছে। দাবিগুলো হলো—আইজিপির ক্রসফায়ার-সংক্রান্ত বক্তব্যের বিষয়ে সরকারের অবিলম্বে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে দ্ব্যর্থহীন অবস্থান ঘোষণা; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আইন ও মানবাধিকারের সীমার মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালনে বাধ্য করা; অতীতের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা; ভবিষ্যতে এ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে গুম, হত্যা, নির্যাতন ও ভয়ের সংস্কৃতির অবসান চেয়েছে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রত্যাশায় মানুষের আত্মত্যাগের অর্থ এই নয় যে এক ধরনের বিচারহীনতার পরিবর্তে আরেক ধরনের বিচারহীনতা প্রতিষ্ঠিত হবে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের প্রত্যাশাও বদলেছে। মানুষ এখন আইনের শাসন, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার চায়।
মায়ের ডাক জানিয়েছে, তারা প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার চায়; বিচারবহির্ভূত হত্যা নয়, আইনের শাসন চায়। রাষ্ট্রের ক্ষমতা মানুষের জীবন রক্ষায় ব্যবহৃত হওয়া উচিত, জীবন কেড়ে নেওয়ার অনুমতি হিসেবে নয়। ক্রসফায়ারের পরিবর্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতির অবসান ঘটানোর আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
