প্রভাত রিপোর্ট: পাড়া-মহল্লার মুদি দোকান থেকে শুরু করে চায়ের দোকান, ছোট খাবারের হোটেল কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র— এসব ব্যবসার মূল ভরসা পরিচিত ক্রেতা ও নিয়মিত লেনদেন। কিন্তু বেচাকেনা কমে যাওয়া, ক্রেতাদের বাকি নেওয়ার প্রবণতা বাড়া এবং সময়মতো সেই পাওনা আদায় না হওয়ায় মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। দোকানের তাকে পণ্য সাজানো থাকলেও নগদ টাকার সংকটে অনেকে নতুন করে মালামাল তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। কারও কারও ব্যবসায়িক পুঁজি আটকে আছে ক্রেতাদের কাছে, আবার কেউ সংসারের খরচ মেটাতে বাধ্য হয়ে দোকানের নগদ আয় থেকে টাকা সরিয়ে নিচ্ছেন।
দোকানিদের মতে, আগে যে ক্রেতা নিয়মিত নগদ টাকায় কেনাকাটা করতেন, তিনিও এখন বাকিতে পণ্য নিতে চাইছেন। কারও বাকি জমছে কয়েক দিন, কারও আবার সপ্তাহ, মাস বা বছর ধরে। পরিচিত ক্রেতাকে সরাসরি ‘না’ বলতে না পেরে দোকানিরা খাতায় নাম ও টাকার অঙ্ক লিখে রাখছেন। কিন্তু খাতার পাতার হিসাব দীর্ঘ হলেও সে অনুযায়ী নগদ টাকা হাতে আসছে না।
খুচরা ব্যবসার মূল বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিদিনের বিক্রির টাকা দিয়েই পরদিনের পণ্য কেনা। এ ব্যবসায় সাধারণত লাভের পরিমাণ সীমিত থাকে। ফলে বিক্রির টাকা ক্রেতার কাছে আটকে গেলে পুরো ব্যবসার নগদ প্রবাহে (ক্যাশ ফ্লো) মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়। পাইকারি বিক্রেতার পাওনা পরিশোধ, দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল এবং পরিবারের নিত্যখরচ মেলাতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা।
বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানে ক্রেতারা চাল, ডাল, তেল, লবণ ও সাবানের মতো জিনিসপত্র অল্প অল্প করে কেনেন। অনেক সময় পুরো টাকা একসঙ্গে পরিশোধ করতে না পেরে তারা বাকিতে নেন। দোকানিরা সম্পর্ক ও মানবিক কারণে এই সুযোগ দিলেও দীর্ঘদিন পাওনা আদায় না হওয়ায় সেই সহযোগিতা তাদের জন্যই কাল হয়ে দাঁড়ায়।
রাজধানীর মাতুয়াইলের তুষারধারা এলাকার কাজী স্টোরের মালিক মো. একরাম শাহ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এখন তো প্রায় সব পণ্যেরই দাম বেশি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় খরচ আরও অনেক বেড়েছে। ফলে আমাদের পুঁজিও বেশি লাগছে, অথচ বিক্রি আগের চেয়ে কমে গেছে। বাকিতে বিক্রি করায় টাকাও আটকে যাচ্ছে। এভাবে ব্যবসা চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাকির একটি বড় অংশ আর ফেরত পাওয়া যায় না। আবার বাকি না দিলেও ক্রেতা পণ্য কিনবেন না; তখন দোকানে নতুন মাল তুলব কী করে? বাধ্য হয়ে অনেক দোকানদারকে পুঁজি ভেঙে সংসার চালাতে হচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, মানুষের আয় সেভাবে বাড়ছে না। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই বিপদে আছে।’ ‘পাঁচ লিটার তেল পাইকারিতে কিনতে ৯৯০ থেকে ৯৯৫ টাকা লাগে, ১ হাজারে বিক্রি করলে লাভ থাকে মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকা। এই সামান্য লাভে কি দোকান চালানো সম্ভব? এর ওপর বাকি পড়লে তো আর রক্ষা নেই।’
দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে ছোট দোকানগুলোর পক্ষে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে বলে মনে করেন মো. একরাম শাহ। বড় দোকান বা সুপারশপের মতো বেশি পণ্য মজুত করার আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই। ফলে সীমিত পুঁজির ব্যবসায় সামান্য ধাক্কাও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে।
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের গুণবতী বাজারে মুদি দোকান চালান আবু খালিদ। তিনি বলেন, ‘আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত অনেকেই এসে বাকি চান। সম্পর্ক রক্ষার খাতিরে তাদের না করা যায় না। কিন্তু সময়মতো সেই টাকা তুলতে গেলে উল্টো মনোমালিন্য ও সম্পর্কের অবনতি ঘটে। অর্থাৎ, বাকি না দিলেও সমস্যা, দিলেও সমস্যা। এখনও বাকির খাতায় কয়েক লাখ টাকা আটকে আছে, যা কোনোভাবেই তোলা যাচ্ছে না।’ ‘মাস শেষে দোকানভাড়া, স্টাফের বেতন, নিজেদের খরচ এবং বিদ্যুৎ বিল নিয়মিত পরিশোধ করতেই হয়। সময়মতো বাকির টাকা না পেলে ব্যবসার পুঁজি দিন দিন ছোট হয়ে আসে। বিক্রি কমে যাওয়া এবং পাওনা আদায়ে এই অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বা পুরোপুরি বন্ধ করতে বাধ্য হবেন’— যোগ করেন তিনি।
এ ধরনের সংকটের প্রভাব কেবল দোকানির একার ওপর পড়ে না। পাড়া-মহল্লার ছোট দোকানগুলো স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন চাহিদার প্রধান উৎস। এর সঙ্গে জড়িত থাকে কর্মচারী, সরবরাহকারী ও তাদের পরিবারগুলোর জীবিকা। ছোট ব্যবসা বন্ধ হলে তাদের আয়ের পথও বন্ধ হয়ে যায়।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক এবং স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, “অর্থনৈতিক ভাষায় বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অ্যাগ্রিগেট ডিমান্ড’ বা সামগ্রিক চাহিদা কমে যাওয়া হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। দেশের সকল নাগরিক, প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি ও সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অর্থনীতিতে যে মোট চাহিদা তৈরি হয়, তাকেই অ্যাগ্রিগেট ডিমান্ড বলা হয়। বর্তমানে এই চাহিদার পরিমাণ একদিকে যেমন কমছে, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত হারেও বৃদ্ধি পাচ্ছে না।”এই সংকট উত্তরণে বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিয়ে অধ্যাপক ওয়ারেসুল করিম বলেন, ‘করের হার হ্রাস, সুদের হার কমানো এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। শুধু মুখে কর্মসংস্থানের কথা বললেই চলবে না; মানুষের বর্তমান আয় না থাকলেও যদি ভবিষ্যতে আয়ের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা থাকে, তবেই তারা ব্যয় করতে উৎসাহিত হয়। একইভাবে, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা যদি দেখেন যে অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, তবেই তারা নতুন বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় কারখানা কিংবা দোকানপাটে কোথাও নতুন কর্মী নিয়োগের কোনো ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।’
উচ্চ সুদের হারকে বিনিয়োগ স্থবিরতার অন্যতম প্রধান কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ কারণেই আমি সুদের হার কমানোর ওপর জোর দিচ্ছি। পাশাপাশি করের বোঝা কমানোর প্রয়োজন থাকলেও সরকার সে পথে হাঁটেনি। বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যাংকঋণের সুদের হার সাড়ে ৯ শতাংশের কাছাকাছি, যা পাকিস্তান বাদে অন্যান্য আঞ্চলিক দেশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।’ অতিরিক্ত সুদের হারের কারণে কোম্পানি ও উদ্যোক্তাগণ নতুন বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না বলে তিনি জানান।
পাশাপাশি জ্বালানি খাতের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘জ্বালানির দাম বাড়লে যেকোনো পণ্যের উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়। সরকার ইতোমধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে, অথচ সুদের হার হ্রাসের ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। সুদের হার কেবল শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ কমানো হয়েছে, যা এই সংকটের জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়। এর ওপর করের চাপ তো রয়েছেই; তাছাড়া নতুন ব্যবসাকে করের জালের আওতায় আনার সরকারি উদ্যোগেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে। সবমিলিয়ে ব্যবসার চড়া খরচ সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।’
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুদের হার ও করের চাপ কমানোর পাশাপাশি জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি। পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের ব্যবধানের বিষয়ে অধ্যাপক করিম বলেন, ‘এই ব্যবধান জোর করে কমানো সম্ভব নয়; বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লে তা স্বাভাবিকভাবেই কমে আসে। এছাড়া, খুচরা ব্যবসায়ীদের পরিচালন ব্যয় হ্রাস পেলেও পণ্যের দামের ওপর থেকে চাপ অনেকটাই কমে যাবে।’ একটি দোকান পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা খরচের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘দোকানভাড়া, চাঁদা, বিদ্যুৎ বিল এবং কর্মচারীদের বেতন বাবদ ব্যবসায়ীদের বিপুল খরচ বহন করতে হয়। বাসাবাড়ির তুলনায় দোকানপাটে চড়া বাণিজ্যিক হারে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয়। এছাড়া, একাধিক কর্মচারী রাখার খরচ তো রয়েছেই। এই বহুমুখী পরিচালন ব্যয় মেটাতে গিয়েই ব্যবসায়ীরা অনেক সময় পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হন। তাই দোকান পরিচালনার খরচ বা ওভারহেড কমানো গেলে খুচরা বাজারেও পণ্যের দামের ওপর স্বস্তি ফিরবে।’
