গাইবান্ধা সদর উপজেলার সাহাপাড়া ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মেসার্স আঙ্গুর ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আব্দুল্লাহ আল মুসাইয়ুব পিয়াসের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকজন সার ডিলার নিয়োগ প্রার্থীরা জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগও করেছেন।
আবেদন প্রার্থী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, তার নামে আগে থেকে দৃশ্যমান কোনো সারের দোকান বা উপযুক্ত গুদাম ছিল না। ঢাকায় লেখাপড়া করার পাশাপাশি কীভাবে তিনি সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ডিলার নিয়োগ পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সার ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতারা।
এদিকে ওই শিক্ষার্থীর বাবা মো. তহমিদুর রহমান আঙ্গুর ক্যামেররা সামনে না কথা বললেও গোপনে বলেন, আমি নির্যাতিত সাবেক সাহাপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক। বিএনপি নেতা জেলা সভাপতির সুপারিশে ডিলার নিয়োগ পেয়েছে আমার ছেলে। এটি তো আমার হক, আমরা পাব না তবে কে পাবে?
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সার ব্যবসায়ী দাবি করেন, তিনি দুই বছরের বেশি সময় ধরে সার, বীজ ও কীটনাশকের ব্যবসা করছেন। নিয়ম মেনে ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেও তিনি নিয়োগ পাননি।
তার অভিযোগ, প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে অনুপযুক্ত ব্যক্তিকে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ওই ব্যবসায়ীর দাবি, নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগ্যতা ও কাগজপত্র পুনরায় যাচাই করে নীতিমালা অনুযায়ী ডিলার নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
অপরদিকে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নতুন নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের কারও আগের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা নেই। তার ছেলে ঢাকায় লেখাপড়া পাশাপাশি ব্যবসা করেন। তার বাড়ির দুটি কক্ষ গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং প্রয়োজন বিবেচনায় নতুন করে আরও ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। এগুলো উদ্দেশ্যমূলকভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে একদল স্বার্থন্বেষী লোকজন।
গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সভাপতি এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
অপরদিকে জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ডিলার নিয়োগের একাধিক আবেদন প্রার্থীদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সদর উপজেলার দায়িত্বে থাকা তদন্তপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একাডেমিক শিক্ষা অফিসার হুমায়ুন কবির তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেন, যা সম্পূর্ণ বহির্ভূত ও স্বেচ্ছাচারিতাপূর্ণ। বর্তমানে প্রাথমিক নিয়োগে প্রাপ্ত ডিলার মেসার্স আঙ্গুর ট্রেডার্সের কোনো ২৫ টনের গোডাউন ছিল না বা নেই। আবেদনপত্রে যে গোডাউন দেখানো হয়েছে তা একটি আবাসিক বাড়ির দুই রুম। আবেদনপত্রে জমির কাগজপত্রে বসতবাড়ি ব্যতীত বাণিজ্যিকভাবে ২৫ টনের কোনো গোডাউন ছিল না। তার ডিলার নিয়োগের প্রাপ্তির পর পত্রে উল্লিখিত ঠিকানা অনুযায়ী গুদাম নির্মাণ করা হচ্ছে।
আঙ্গুর ট্রেডার্স প্রোপাইটারে আব্দুল্লাহ আল মুসাইয়ুব পিয়াস পেশায় একজন ছাত্র। বর্তমানে সে স্নাতক প্রথম বর্ষের নিয়মিত ঢাকায় একটি কলেজের ছাত্র। ঠিকানা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান নেই, ট্রেড লাইসেন্স যা দিয়েছেন তা একদম মিথ্যা ও বানোয়াট। তার কোনো ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এবং আয় নেই। তবে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন তিনি। বাবা তহমিদুর রহমান আঙ্গুর এমপিওভুক্ত ভুলভাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক। আবেদনপত্রে তথ্য গোপন, ঠিকানা, পেশা মিথ্যা হওয়ায় সচেতন মহল তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এই বিষয়গুলো সঠিক তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে ওই অভিযোগপত্রে।
সরেজমিনে স্থানীয় এবং সংশ্লিষ্ট সার ডিলার নিয়োগ প্রার্থীদের সূত্রে জানা গেছে, সাহাপাড়া ইউনিয়নের তুলসীঘাট বাজারের গোডাউন রোডে পিয়াসের বাবার বাড়ি। অভিযোগ রয়েছে, ওই বাড়ির দুটি কক্ষকে গুদাম দেখিয়ে ডিলারশিপের জন্য আবেদন করা হয়। নিয়োগ পাওয়ার পর বাড়ির সামনে নতুন করে গুদাম ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আগে সারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও পিয়াস ডিলারশিপ পেয়েছেন। এমনকি তার নামে বৈধ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান না থাকা সত্ত্বেও অর্থের বিনিময়ে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয়দের সারের ডিলার নিয়োগের আবেদন প্রার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ডিলার নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আবেদনকারীর যোগ্যতা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, গুদাম এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, তা নিয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে।
সাহাপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শ্রী বিকাশ চন্দ্র বলেন, যার কোনো প্রতিষ্ঠান নেই, যিনি আগে ব্যবসা করেননি এবং যার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা নেই, এমন ব্যক্তি কীভাবে সারের ডিলারশিপ পেলেন, তা দুঃখজনক। তিনি এ নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
গাইবান্ধা সদর উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, ডিলার নিয়োগ যাচাই-বাছাই কমিটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়া অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে জেলা প্রশাসক বরাবর স্থানীয় লিপি রানী, সোবহান মন্ডল, শরিফুল ইসলামসহ বিকাশ সাহার মতো একাধিক সার ডিলার নিয়োগের আবেদন প্রার্থী লিখিত অভিযোগ করলেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ড. মো. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা দিলেও সেটির কোনো জবাব আসেনি।
