বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন প্রবৃদ্ধির হার কত হবে, তা নয়; বরং অর্থনীতির গতি কীভাবে ফিরবে, মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি কীভাবে আসবে এবং বিপুল জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল জনশক্তিতে রূপান্তর করা যাবে কীভাবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, প্রবাসী আয় ও রপ্তানিতে কিছু ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও বিনিয়োগের স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, জ্বালানি সংকট ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা অর্থনীতির সম্ভাবনাকে আটকে রেখেছে।
এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, পরিবেশ, নগর ব্যবস্থাপনা ও পররাষ্ট্রনীতিকে একটি সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। কারণ বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা শুধু তার সম্পদ কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে না। সেই সম্পদ কতটা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগানো যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর, নীতিনির্ধারণ কতটা দূরদর্শী এবং সাধারণ মানুষের জন্য কতটা সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তার ওপরও নির্ভর করে ভবিষ্যৎ।
প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য আর বাস্তবতার ব্যবধান : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭- উভয় অর্থবছরেই বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। এই ব্যবধান অর্থনীতির সামনে থাকা চ্যালেঞ্জের গভীরতা তুলে ধরে। অর্থনীতির গতি বাড়াতে হলে প্রথমেই উৎপাদন ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, ব্যবসায়িক নিয়মকানুনের পূর্বানুমানযোগ্যতা, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা এবং সহজ শর্তে উৎপাদনমুখী ঋণ নিশ্চিত করা জরুরি। উদ্যোক্তারা যখন নতুন বিনিয়োগের সম্ভাব্য মুনাফা, ব্যয় ও ঝুঁকি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান, তখনই তারা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত হন। অথচ বর্তমানে জ্বালানি সংকট, ঋণের উচ্চ ব্যয়, দুর্বল বেসরকারি ঋণপ্রবাহ এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে আছে। দেশীয় বিনিয়োগ দুর্বল থাকলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও কঠিন হয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু বাজারের আকার দেখেন না; তারা বিচার করেন অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি, মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ, চুক্তি বাস্তবায়ন এবং আইনের শাসন কতটা নির্ভরযোগ্য।
বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের প্রবাহেও সতর্কবার্তা রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে নিট বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ এসেছে ১৪৭ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ কম। বিনিয়োগ বাড়াতে তাই কেবল আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সম্ভাবনার কথা বলা যথেষ্ট নয়; বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বাধা কমাতে হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া স্বস্তি ফিরবে না : সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনীতির সাফল্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান মাপকাঠি বাজারদর। আয় বাড়লেও খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় যদি দ্রুত বাড়ে, তাহলে পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ফলে মোট দেশজ উৎপাদন বাড়ার পরিসংখ্যানের সঙ্গে মানুষের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার দূরত্ব তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও বেড়ে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ বাজারে মূল্যচাপ পুরোপুরি কাটেনি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু সুদের হার বাড়ানো কিংবা কমানোর ওপর নির্ভর করলে হবে না। কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা, সংরক্ষণ, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা বাজারের প্রতিযোগিতা এবং আমদানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা চিহ্নিত করতে হবে। মৌসুমি পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ, বাজারের তথ্য প্রকাশ, প্রতিযোগিতা আইন প্রয়োগ এবং অযৌক্তিক মজুদদারি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা বাড়াতে হবে। কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। সীমিত আয়ের পরিবারকে আয়ের বড় অংশ খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় করতে হয়। ফলে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ব্যয় সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল্যায়নে এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো অপরিহার্য : অর্থনীতিতে ব্যাংকের কাজ শুধু আমানত সংগ্রহ ও ঋণ দেওয়া নয়; সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর করাও। ব্যাংকিং খাতে ঋণ ব্যবস্থাপনা দুর্বল হলে, খেলাপি ঋণ বাড়লে এবং ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা না থাকলে তার প্রভাব পড়ে শিল্প, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে।
ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরলে আমানতকারীরা নিরাপদবোধ করবেন, উদ্যোক্তারা অর্থায়ন পাবেন এবং সঞ্চয়ের অর্থ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে। আর্থিক খাতের সংস্কার তাই কেবল ব্যাংকারদের বিষয় নয়; এটি পুরো অর্থনীতির কর্মক্ষমতা পুনরুদ্ধারের শর্ত।
প্রযুক্তি ও জনশক্তি : সম্ভাবনাকে সম্পদে রূপান্তর : বাংলাদেশের অন্যতম বড় শক্তি তার বিপুল জনসংখ্যা। কিন্তু জনসংখ্যা নিজে থেকেই সম্পদ হয়ে ওঠে না। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগের মাধ্যমে মানুষকে উৎপাদনশীল করে তুলতে হয়। তা না হলে জনসংখ্যার আকার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি সামাজিক চাপও বাড়াতে পারে। বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, ডিজিটাল বাণিজ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সেবা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ধরন বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের সুবিধা নিতে পারে। সফটওয়্যার, ডিজিটাল সেবা, অনলাইন বাণিজ্য, আর্থিক প্রযুক্তি, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষি প্রযুক্তিতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ রয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেন ও সরবরাহব্যবস্থার সংযোগ বাড়ানো গেলে উৎপাদনশীলতা ও বাজারে প্রবেশের সুযোগও বাড়বে।
তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য শুধু স্মার্টফোন কিংবা ইন্টারনেট সংযোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, ভাষাগত সক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং প্রযুক্তিকে বাস্তব সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করার যোগ্যতা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে বিশ্লেষণ, গবেষণা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সমাধান বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে নয়, সমন্বিত সংস্কারে : বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনা আছে, কিন্তু সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও নীতির ধারাবাহিকতা। আইন ও নীতিমালা থাকা যথেষ্ট নয়; সেগুলোর প্রয়োগে সমতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ ও উৎপাদনশীল অবকাঠামোর প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও ন্যায্য করতে হবে। সীমিত রাজস্বের কারণে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যয় বাধাগ্রস্ত হলে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি দুর্বল হয়। করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি প্রতিরোধ, সরকারি প্রকল্পের ব্যয়ে স্বচ্ছতা এবং ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন তাই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর : উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়ানো, দক্ষ ও দায়িত্বশীল জনশক্তি তৈরি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। প্রযুক্তি এই তিন ক্ষেত্রকে এগিয়ে নিতে পারে, কিন্তু প্রযুক্তির সুফল পেতে প্রয়োজন শিক্ষা, নৈতিকতা, সুশাসন ও কার্যকর নীতিমালা।
অর্থনীতির স্থিতিশীলতা মানে শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়া নয়; এর অর্থ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা, কর্মসংস্থান তৈরি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনা। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো সাময়িক স্বস্তিকে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতায় রূপান্তর করা। সেই লক্ষ্য অর্জিত হলে দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, উদ্যোক্তা শক্তি ও প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা মিলিয়ে একটি অধিক উৎপাদনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
রাজু আলীম : কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব
মতামত লেখকের নিজস্ব
