এক লাখ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট আত্মসাতের অভিযোগে উখিয়া উপজেলার বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই গোলাম কিবরিয়াকে নিয়ে যখন তোলপাড় চলছে, ঠিক সেদিনই প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে উখিয়া থানায় গিয়ে তাঁর হাতে নগদ অর্থ পুরস্কার তুলে দিয়েছেন কক্সবাজারের ‘বিতর্কিত’ পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান।
বিজ্ঞাপন
রোববার বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ওই পুলিশ কর্মকর্তার ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ ও তুমুল সমালোচনা হয়। ঠিক একই দিনে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের বদলে পুরস্কৃত করার ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়েছেন খোদ পুলিশ সুপার।
পুলিশের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, মাসিক সভায় সর্বোচ্চ মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সদস্যদের পুরস্কৃত করা হয়। কিন্তু সেই রীতির বাইরে গিয়ে অভিযোগ প্রকাশের দিনই উখিয়া থানায় হাজির হয়ে এসআই কিবরিয়ার হাতে নিজে পুরস্কার তুলে দেন পুলিশ সুপার। একই ঘটনায় উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও (ওসি) নগদ অর্থ পুরস্কার দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ২২ অক্টোবর সকাল ১১টার দিকে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী এলাকা থেকে ছৈয়দুল বশর ওরফে সিসি বশরকে আটক করে পুলিশ। অভিযানে এসআই গোলাম কিবরিয়ার নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল অংশ নেয়।
অভিযোগকারী ও প্রত্যক্ষদর্শী সরওয়ার সিকদারের দাবি, ওই অভিযানে দেড় লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু এসআই কিবরিয়াকে বাদী করে দায়ের করা মামলার এজাহারে মাত্র ৫০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দের কথা উল্লেখ করা হয়। বাকি এক লাখ পিস ইয়াবা সরিয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। সরওয়ারের অভিযোগ, উদ্ধারকৃত সেই এক লাখ পিস ইয়াবা পরে এক কোটি ১০ লাখ টাকায় মাদক কারবারিদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
সরওয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিকে প্রথমে বালুখালী পুলিশ ফাঁড়িতে এবং পরে উখিয়া থানায় নেওয়া হয়। এরপর বালুখালীর জোড়াব্রিজ এলাকায় ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়টি কাগজে-কলমে দেখানো হয়।
তবে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা দুই সাক্ষী দেলোয়ার ও সাদ্দাম জানিয়েছেন, পুলিশের অভিযান ও ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। এমনকি মামলায় সাক্ষী হিসেবে তাঁদের নাম থাকার বিষয়েও তাঁরা অবগত নন বলে দাবি করেছেন।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, জব্দতালিকা, মামলার নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করলে উদ্ধার করা ইয়াবার প্রকৃত পরিমাণ উন্মোচিত হবে।
পুলিশ সূত্রের দাবি, ২২ অক্টোবর ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার ও একজনকে গ্রেপ্তারের স্বীকৃতি হিসেবেই এসআই কিবরিয়া ও ওসিকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। তবে একই অভিযানে এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে গুঞ্জন ও প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘এসপি স্যার যে এমন ভুল করবেন, সেটা আমরা নিজেরাও বুঝতে পারিনি। নিয়ম অনুযায়ী, মাসিক সভায় এ পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে।’
এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তসাপেক্ষ। তবে অভিযোগ প্রকাশের দিনই অভিযুক্ত এসআইকে পুরস্কৃত করার ঘটনা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, উদ্ধার করা ইয়াবার প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও বিতর্কিত ভূমিকা
এদিকে এসপি সাজেদুর রহমান কক্সবাজারে যোগদানের পর থেকে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম নাজুক হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি দিনদুপুরে ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কে গণডাকাতির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে অন্তত অর্ধশত যানবাহনে লুটপাট চালানো হয়।
শুধু তাই নয়, পুলিশ সুপার কার্যালয়ের ঠিক সামনেই মিলেছে ইয়াবার গুদাম। সম্প্রতি সেই গুদাম থেকে তিন লাখ পিস ইয়াবাসহ তিন মাদক কারবারিকে আটক করে পুলিশ। তবে অভিযানের সময় সেখান থেকে দুই লাখ পিস ইয়াবা গায়েব হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে পুরো জেলায় তোলপাড় শুরু হয়। অভিযোগ আছে, ইয়াবা গায়েবকারীকে খুঁজে বের করতেও এসপির কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি।
পুলিশের একাধিক সূত্রের দাবি, যোগদানের পর থেকে নানা অপকর্মে জড়িত ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের শাস্তির বদলে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন এই পুলিশ সুপার। তার সর্বশেষ প্রমাণ— এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতে অভিযুক্ত এসআই কিবরিয়াকে নগদ অর্থ পুরস্কার প্রদান।
পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদানের পর থেকে জেলায় খুন, ধর্ষণ, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের পাশাপাশি আদালত প্রাঙ্গণে গোলাগুলি এবং বিচারককে অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানোর মতো অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা, তদন্তের নিরপেক্ষতা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে কক্সবাজারে ৯৫টি খুন, ১২৭টি ধর্ষণ ও ২৯৭টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে দেড় শতাধিক। এছাড়াও পর্যটন এলাকাসহ জেলায় প্রতিদিন ১৫ থেকে ৩০টি চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে। তবে অনেক ঘটনায় মামলা বা জিডি না হওয়ায় প্রকৃত চিত্র পরিসংখ্যানে উঠে আসছে না।
আদালত প্রাঙ্গণের নিরাপত্তার চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আদালত প্রাঙ্গণে এক যুবক পিস্তল দেখিয়ে একজন বিচারককে ভয় দেখান বলে জানিয়েছেন জেলা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারক। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরে দুই বিচারক তৎকালীন সদর থানার ওসি ছমিউদ্দীনকে ডেকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করেন। বিষয়টি পুলিশ সুপারকেও জানানো হয়েছিল, কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারিতে একাধিক বিচারক পুলিশ সুপারের কাছে গানম্যান চেয়ে চিঠি দিলেও তাঁদের নিরাপত্তারেক্ষী দেওয়া হয়নি, এমনকি চিঠির জবাবও মেলেনি। এর মধ্যে গত ২৪ মে আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে গোলাগুলিতে দুজন গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হন।
গত ২৪ মার্চ রাতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ছুরিকাঘাতে নিহত হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক খোরশেদ আলম। ঘটনার পর তারিন নামের এক নারীকে আটক করে পুলিশ এবং তাঁর ব্যাগ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধারের কথা জানায়। তবে খোরশেদের জানাজা চলাকালেই এক সংবাদ সম্মেলনে তারিনকে নির্দোষ ঘোষণা করেন পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান। এতে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই পুলিশ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরবর্তীতে নিহত খোরশেদের পরিবার পুলিশের তদন্তে অনাস্থা জানালে আদালত মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) স্থানান্তর করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রাথমিক তদন্তে অভিযুক্ত তারিনকে আসামি না করে কেবল সাক্ষী করা হয়েছিল।
গত ২২ এপ্রিল কক্সবাজার শহরতলির খুরুশকুলে মন্দিরের সেবায়েত নয়ন সাধুকে হত্যার পর তাঁর লাশ গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন সংবাদকর্মী অন্তর দে বিশাল। তাঁর অভিযোগ, সংবাদটি সরিয়ে না ফেললে তাঁকে হত্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেন এসপির আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত এলআইসি সদস্য সোহেল। অন্তর দে জানান, বিষয়টি এসপিকে জানালে তিনি উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘আপনাকে নিউজ করতে কে বলেছে?’ পরে সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে সদর থানা জিডি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।
অন্যদিকে, ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগের তথ্যপ্রমাণ নিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে একটি জাতীয় দৈনিকের স্থানীয় সংবাদদাতা শাহেদ ফেরদৌস হিরুকে এসপি প্রশ্ন করেন, ‘ইয়াবা নিয়ে সাংবাদিকদের এত আগ্রহ কেন?’ হিরুর অভিযোগ, এসপির ব্যর্থতা, অদক্ষতা ও পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণেই জেলার সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে।
বাহিনীতে অসন্তোষ ও নাগরিক প্রতিক্রিয়া
জেলা পুলিশের অন্তত ৩৫ জন কর্মকর্তার অভিযোগ, এসপির হঠকারী সিদ্ধান্ত, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বদলি এবং কথায় কথায় বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) ও সার্ভিস বুকে বিরূপ মন্তব্যের ভয় দেখানোর কারণে অভ্যন্তরীণ বাহিনীতে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি গোপন তথ্য প্রকাশের অভিযোগে ১০১ জন পুলিশ সদস্যকে গণবদলি করা হয়; যাদের মধ্যে সাতজন পরিদর্শক, ৩৬ জন এসআই, ২৪ জন এএসআই ও ৩৪ জন কনস্টেবল রয়েছেন। কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, অভিজ্ঞ সদস্যদের সরিয়ে দেওয়ায় স্থানীয় অপরাধপ্রবণ এলাকা সম্পর্কে মাঠপর্যায়ের জ্ঞান ও অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এমন একজন ব্যক্তি কীভাবে কক্সবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলার পুলিশ সুপার হন, তা আমার বোধগম্য নয়। তিনি যোগদানের পর থেকে পুলিশের হেফাজত থেকে ইয়াবা গায়েব হওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরপরও তিনি নির্লজ্জের মতো বিতর্কিত কর্মকর্তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর এসব কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয়, তিনি কক্সবাজারের মানুষের সঙ্গে তামাশা করতে এসেছেন।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে এসপি এএনএম সাজেদুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
তবে ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত না করে উল্টো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল কুদ্দুস গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনাটি সম্পর্কে তিনি পূর্বে অবগত ছিলেন না। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন তিনি।
এমএইচ
