দেশের দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারগুলোকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনতে পরিবারভিত্তিক সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলছে সরকার। এ উদ্যোগের আওতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন করে ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরিবারের আয়, সম্পদ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও জীবিকার তথ্য যাচাই করে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার শনাক্ত করা হবে। একই সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ডকে ধীরে ধীরে সমন্বিত সামাজিক নিবন্ধন ও অর্থপ্রদানের ব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ৭০ হাজার ৮৬১টি পরিবার ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। পাইলট কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কর্মসূচিটি আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গত ১০ অক্টোবর থেকে সারাদেশে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও কার্যক্রম সম্প্রসারণ শুরু হয়েছে।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারগুলোকে তথ্যভিত্তিকভাবে চিহ্নিত করা। সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা যেন যোগ্য পরিবারের কাছে পৌঁছায় এবং বাদ পড়া দরিদ্র পরিবারগুলোকেও শনাক্ত করা যায়, সে লক্ষ্যেই কাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, পরিবারের আয়, সম্পদ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও জীবিকার তথ্য বিবেচনায় নিয়ে উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে। পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তথ্যভাণ্ডার নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বলেন, ফ্যামিলি কার্ডকে শুধু ভাতা বিতরণের কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত সামাজিক নিবন্ধনব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে একই তথ্যভিত্তি ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, তথ্য সংগ্রহকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের সদস্যসংখ্যা, আয়, সম্পদ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করবেন। ট্যাবলেট কম্পিউটারের মাধ্যমে এসব তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা হবে। ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলেও অফলাইনে তথ্য সংগ্রহ করা যাবে। পরে নেটওয়ার্ক পাওয়া গেলে সংগৃহীত তথ্য কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে পাঠানো হবে।
মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। তথ্য সংগ্রহকারীরা নির্ধারিত এলাকায় গিয়ে কাজ করছেন কি না, তা অবস্থানভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহ্বুব বলেন, তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য তথ্য সংগ্রহকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সংগৃহীত তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হবে। পাইলট কার্যক্রমে চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধান করে জাতীয় পর্যায়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ফ্যামিলি কার্ডের উপকারভোগী নির্বাচনে রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত সুপারিশের পরিবর্তে পরিবারের প্রকৃত আর্থসামাজিক অবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সম্পদ ও আর্থিক সক্ষমতা যাচাই পদ্ধতি বা পিএমটি ব্যবহার করা হচ্ছে। পরিবারের আয়-ব্যয়, সম্পদ, বাসস্থান ও জীবনযাত্রার বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে স্কোর নির্ধারণ করে যোগ্যতা যাচাই করা হবে।
তবে পাইলট পর্যায়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের ভুল, নিজ নামে মোবাইল নম্বর না থাকা এবং ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক হিসাবসংক্রান্ত কিছু সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি সম্প্রসারণের আগে এসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ব্যাংক ও ডিজিটাল আর্থিক সেবার সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড যুক্ত করা হবে। এর ফলে সরকারি সহায়তার অর্থ সরাসরি উপকারভোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমানো এবং অর্থপ্রদানে স্বচ্ছতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া সহায়তা পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থান ও জীবিকার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা মূল্যায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, পরিকল্পনাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচন আরও নির্ভুল হবে। পাশাপাশি পরিবারভিত্তিক সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার গড়ে ওঠায় সরকারি সহায়তা প্রকৃত দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের কাছে পৌঁছানো এবং সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার স্বচ্ছতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
The post পরিবারভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার গড়ছে সরকার appeared first on ভোরের চেতনা.
