সাভারের আশুলিয়ায় তোহফাতুল জান্নাহ নামের একটি মহিলা মাদ্রাসার ১৩ বছর বয়সী এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ছাত্রীর দাদার করা মামলায় শিক্ষকের স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক এখনো পলাতক। এদিকে মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেছেন অভিযুক্ত শিক্ষকের ছেলে।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে প্রায় পাচ শতাধিক মানুষ বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার নিয়ে মানববন্ধন করেন। এ সময় অভিযুক্ত শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং মাদ্রাসায় ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষার্থীর দাবি, এর আগেও ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের অভিযোগ উঠেছিল। পাশের বাড়ির এক নারী রাতে মাদ্রাসায় গাড়ি আসা-যাওয়া এবং মেয়েদের কান্না ও চিৎকারের শব্দ শোনার কথাও জানিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
ঘটনার পরদিন রোববার (২৫ অক্টোবর) কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের উচ্চপর্যায়ের নেতারা প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ সময় তাঁরা ভুক্তভোগী ছাত্রী ও তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেননি। এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এলাকাবাসী।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে জুতা আনতে মাদ্রাসার নিচতলায় যায় ওই ছাত্রী। এ সময় প্রায় ৫০ বছর বয়সী প্রধান শিক্ষক তাকে একটি কক্ষে নিয়ে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনার কথা কাউকে না জানাতে শিক্ষকের স্ত্রী ওই ছাত্রীকে হুমকি দেন বলেও মামলায় উল্লেখ রয়েছে।
পরে কাদতে কাদতে বাড়িতে ফিরে পরিবারের সদস্যদের কাছে ঘটনা জানায় শিশুটি। এরপর পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে মাদ্রাসায় গিয়ে শিক্ষকের স্ত্রীকে আটক করেন। তবে তার আগেই অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক পালিয়ে যান।
ওই দিন রাতে শিশুটির দাদা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলায় সহযোগিতার অভিযোগে শিক্ষকের স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হওয়ার একদিন পর মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ এনে পাল্টা মামলা করেন অভিযুক্ত শিক্ষকের ছেলে মো. উমায়ের।
মামলার এজাহারে আক্তার, মনসুর, আব্দুর রহিম, সালমা, শাহ আলম ও শাহাজউদ্দিনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, গত বুধবার সন্ধ্যায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একদল লোক মাদ্রাসায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করেন। এ সময় নগদ ৪৭ লাখ টাকা, ১২ ভরি সোনা, জমির দলিল, পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ মোট ৭৭ লাখ টাকার ক্ষতিসাধন হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এ অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। পুলিশ জানিয়েছে, পাল্টা মামলাটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মাদ্রাসার পাশের বাড়ির এক নারী বাসিন্দা দৈনিক যায়যায়দিনকে বলেন, রাত ২টা থেকে ৩টার দিকে প্রায়ই মাদ্রাসায় কালো ও সাদা রঙের হাইয়েস গাড়ি আসত। ফজরের আজানের আগেই গাড়িগুলো চলে যেত।
ওই নারী বলেন, রাতে গাড়ি আসার শব্দ শুনে দরজা খুলে বাইরে তাকালে গাড়ি দেখতে পেতেন। মাঝেমধ্যে গভীর রাতে চিৎকার ও মেয়েদের কান্নার মতো শব্দও শুনতেন। তাঁর ভাষ্য, মাদ্রাসাটি চালু হওয়ার পর থেকেই এমন গাড়ির আসা-যাওয়া দেখেছেন।
কেন এত রাতে গাড়ি আসে, তা জানতে চাইলে মাদ্রাসার এক দায়িত্বশীল নারী তাকে বলতেন, বাড়িতে অতিথি আসেন। ওই প্রতিবেশী আরও অভিযোগ করেন, মাদ্রাসার ওই নারীর আচরণ তার কাছে ভালো মনে হয়নি। তবে রাতে গাড়ি আসা কিংবা শব্দ শোনার বিষয়গুলো থেকে কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এসব অভিযোগেরও তদন্ত প্রয়োজন।
মাদ্রাসাটির এক সাবেক নারী শিক্ষার্থী মানববন্ধনে অংশ নিয়ে দৈনিক যায়যায়দিনকে বলেন, তিনি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ও এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখেছেন বলে তাঁর দাবি। এসব ঘটনার কারণে তাঁরা মাদ্রাসা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
ওই সাবেক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, তিনি সেখানে পড়ার সময় প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন ছাত্রীকে কক্ষে নিয়ে যেতেন এবং তাদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করতেন। কয়েকটি ঘটনা তিনি নিজে দেখেছেন বলেও দাবি করেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মাদ্রাসার নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন তানজিলা। তিনি দৈনিক যায়যায়দিনকে বলেন, ঘটনার দিন তিনি নিচতলায় কাপড় ধুতে গিয়েছিলেন। যে কক্ষে তিনি কাপড় ধুতেন, সেই কক্ষের দরজা ভেতর থেকে আটকানো ছিল। প্রায় ১০ মিনিট ডাকাডাকির পর দরজা খোলা হয়।
তানজিলার ভাষ্য, দরজা খোলার পর প্রধান শিক্ষককে অস্থির অবস্থায় দেখতে পান। তিনি তাঁদের ওপরের তলায় চলে যেতে বলেন। পরে পর্দার আড়াল থেকে তিনি অভিযুক্ত শিক্ষককে ছাত্রীটিকে কক্ষ থেকে বের করে দিতে দেখেন বলে দাবি করেন।
তানজিলা আরও বলেন, মেয়েটির শরীরে ধুলা দেখতে পেয়ে তিনি তার কাছে ঘটনার বিষয়ে জানতে চান। তখন ছাত্রীটি তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে এবং প্রধান শিক্ষক তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছেন বলে জানায়।
তানজিলার দাবি, পরে তিনি শিক্ষকের স্ত্রীকে ডেকে বিষয়টি জানান। শিক্ষকের স্ত্রী ছাত্রীটিকে চুপ থাকতে এবং বিষয়টি কাউকে না বলতে বলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। অন্যদিকে প্রধান শিক্ষক অভিযোগ অস্বীকার করে কোরআন ছুঁয়ে নিজের নির্দোষ হওয়ার দাবি করেন বলেও তানজিলা জানিয়েছেন।
তানজিলার এসব বক্তব্য মামলার অভিযোগ ও তদন্তের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। ভুক্তভোগী শিশুটির সুরক্ষা ও গোপনীয়তা বজায় রেখে ঘটনার সত্যতা নির্ধারণ করা জরুরি।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা ইস্রাফিল খোকন দৈনিক যায়যায়দিনকে বলেন, বেফাকের নেতাদের মাদ্রাসা পরিদর্শনের পাশাপাশি ভুক্তভোগী ছাত্রী ও তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করা উচিত ছিল। তার অভিযোগ, তারা আগে মাদ্রাসা পরিদর্শন করলেও ভুক্তভোগী পরিবারের খোঁজ নেননি। এ কারণে এলাকাবাসীর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
মাদ্রাসাটির এক শিক্ষার্থীর মা বলেন, তার মেয়েও ওই প্রতিষ্ঠানে পড়ে। একজন কন্যাসন্তানের মা হিসেবে তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানান এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। অভিযুক্ত শিক্ষক গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেন তিনি।
স্থানীয় তরুণ শাওনের অভিযোগ, এলাকার বিভিন্ন মেয়েকে নানা উপায়ে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্থানীয়দের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। পাল্টা মামলায় লুটপাটের যে পরিমাণ অর্থ ও সম্পদের কথা বলা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার নিয়ে ধর্ষণের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। তাদের দাবির মধ্যে ছিল অভিযুক্ত শিক্ষককে দ্রুত গ্রেপ্তার, সুষ্ঠু তদন্ত, ন্যায়বিচার এবং মাদ্রাসায় ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোশাররফ হোসেন জানান, শিশুটির দাদার করা ধর্ষণ মামলায় মাদ্রাসার মালিকের স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষককে গ্রেপ্তারের বিষয়ে আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তিনি দেননি।
তিনি আরও জানান, মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে শিক্ষকের ছেলের করা মামলাটিও পুলিশ তদন্ত করছে। এ ঘটনায় একদিকে শিশুটির প্রতি যৌন সহিংসতার অভিযোগ, অন্যদিকে মাদ্রাসায় হামলা ও সম্পদ লুটের পাল্টা অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট সবার আইনি অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
