পাবুর ভীষণ ভয় ভূত দেখলে। কিন্তু তার থেকেও বেশি ভয় ভূতের ভয় পেলেই মা বকবেনÑ ভিতু কোথাকার! ভূত বলে কিছু নেই, সব মনের ভুল!
আজ রোববার, দুপুরবেলা। ঘরে কেউ নেই।
বাবা ঘুমাচ্ছেন, মা গেছেন পাশের ফ্ল্যাটে। পাবু একা একা ড্রইংরুমে বসে আঁকছে। ঠিক তখনই শোবার ঘরের দরজাটা ক্যাঁও... করে একটু ফাঁক হয়ে গেল।
পাবু গলা খাঁকড়ে বলল, কে ওখানে? আম্মু নাকি?
উত্তর এলো না। তবে ঠান্ডা একটা হাওয়া এসে পাবুর চুলগুলো উসকে দিল। পাবু ভয়ে ভয়ে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল ওদিকে। খাটের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে একটা আস্ত ভূত! ধবধবে সাদা চাদর তার গায়ে, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। হাওয়া নয়, ভূতটার মুখ থেকে কড়া কফি এবং লবঙ্গর গন্ধ বেরোচ্ছে।
পাবু এবার থরথর করে কাঁপতে শুরু করল ভয়ে। ঢোঁক গিলে বলল, তু... তুমি কে?
ভূতটা চশমাটা নাক থেকে একটু নামিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, আমি ভূত নম্বর ৪২০। তোকে একটা জরুরি কথা বলতে এসেছি।
পাবু কাঁদো কাঁদো সুরে বলল, আম... আমাকে খেয়ো না ভূত ভাইয়া! আমার গায়ে মাংস নেই, সব হাড্ডি। তোমার দাঁতে ব্যথা হবে!
ভূতটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানা থেকে নেমে এলো। তারপর ড্রইংরুমের সোফায় ধপ করে বসে বলল, আরে দূর! তোকে কে খাবে? ভূত কি মানুষ খায় নাকি? ওগুলো সব রূপকথার গপ্পো।
আজ তোকে ধরতে এসেছি অন্য কারণে। তোর গণিত খাতা কই?
পাবু তো ভড়কে গেল! ‘গণিত খাতা? সে তো
স্কুল ব্যাগে...’
‘তাড়াতাড়ি নিয়ে আয়!’ ভূতটি ধমক দিয়ে উঠলেন। ‘কাল তোর স্যার তোকে ক্লাসে জ্যামিতি করতে দিয়েছিল, তুই তিন নম্বর উপপাদ্যটা ভুল করেছিস কেন? একাত্তর আর ঊনআশির গুণফল লিখেছিস ছাতানব্বই! এ কী অনাচার! ভূতের সমাজে কি এসব সহ্য করা যায়?’
পাবু অবাক হয়ে বলল, ভূতের সমাজে আবার পড়ালেখার কি দরকার?
ভূতটা চোখ গোল গোল করে বললেন, দরকার নেই মানে? ভূতের জীবন কী সহজ ভেবেছিস? ভূত হওয়ার পর আমাদেরও তো রোজ রাতের বেলা হিসাব রাখতে হয়Ñ কজন মানুষকে ভয় দেখালাম, কটা চাদর ময়লা হলো, কবরখানায় আলো ঠিকমতো জ্বলছে কি না। এসব হিসাব করতে গিয়ে আমার তো মাথা ঘুরে যায়! আর তোরা দিনে-দুপুরে অংক ভুল করবি? আজ তোকে সঠিক নিয়ম শিখাব, তবেই ছাড়ব।
বলেই ভূতটি ড্রইংরুমের হোয়াইটবোর্ডের সামনে গিয়ে খড়খড় করে অংক কষে দিতে লাগলেন। পাবু দেখল, এই ভূতটার হাতের লেখা ভীষণ সুন্দর, মুক্তোর মতো। ভুল হলে নিজেই খিকখিক করে হেসে শুধরে নিচ্ছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। মা যখন ফ্ল্যাটে ঢুকলেন, তখন ড্রইংরুম থেকে ভেসে আসছে চঞ্চল গলাÑ’ আচ্ছা ভূত, এই যোগটা কি এভাবে ক্যারি ওভার করতে হবে?’
‘হুঁ, বুদ্ধিমান আছিস তো! একদম ঠিক ধরেছিস।’
মা দরজা খুলে অবাক হয়ে দেখলেন, রুমে কেউ নেই। শুধু একটা বোর্ডের ওপর চক দিয়ে অংক করা, এবং টেবিলের ওপর লবঙ্গর টুকরো পড়ে আছে। পাবু মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আম্মু, আজ থেকে আমার আর ভূতকে একটুও ভয় করবে না। ভূতটা বড্ড ভালো, তবে পড়া না পারলে বকে!
মা মুচকি হেসে বললেন, বেশ তো, তাহলে কালকের স্কুলের হোমওয়ার্কটা আজকেই শেষ করে ফেল, দেখি তোমার ভূতু স্যার কতটা শিখিয়েছে!
