প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফরের প্রথম দিনেই দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসো, বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকি এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সার কারখানার আধুনিকায়ন, নতুন শিল্প স্থাপন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, জ্বালানি নিরাপত্তা ও চলমান উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপানের সহযোগিতা চেয়েছে ঢাকা। আগামীকাল মঙ্গলবার জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।
বিনিয়োগ বাড়াতে জাপানের সহযোগিতা চান তারেক
আজ সোমবার বিকেল ৩টায় টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের সভাপতি তারো আসোর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। আলোচনায় উঠে আসে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, জাপানি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়।
প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানান, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের পরিপ্রেক্ষিতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে তারো আসোর সহযোগিতা চান তারেক রহমান। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতেও জাপানের অব্যাহত সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।
তারো আসোর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। ২০০৬ সালে বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে জাপান সফরের সময় তাঁদের সাক্ষাতের কথা স্মরণ করেন তিনি। জাপানের প্রধানমন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তারো আসোর ভূমিকার প্রশংসা করেন তারেক রহমান।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটও গুরুত্ব পায়। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে জাপানের সহযোগিতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তারো আসো ও সংসদীয় মৈত্রী লীগের সদস্যদের বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণও জানান তিনি।
সার কারখানা থেকে প্রযুক্তি, মারুবেনির দিকে বাংলাদেশের নজর
বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকির সঙ্গে বৈঠকে বসেন তারেক রহমান। বাংলাদেশের কোন কোন খাতে জাপানি বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে, সেই আলোচনায় অটোমোবাইল, অর্ধপরিবাহী, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উন্নত উৎপাদনশিল্পকে গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে আলোচনার পরিধি শুধু নতুন বিনিয়োগের আহ্বানে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, কর্ণফুলী সার কারখানার আধুনিকায়ন এবং দেশে দ্বিতীয় একটি সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাইয়েও জাপানের সহযোগিতা চান তিনি।
বাংলাদেশের প্রত্যাশা, জাপানের প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে শিল্প উৎপাদন বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে। এ জন্য বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি, শিল্প ও অবকাঠামো খাতে মারুবেনির বিস্তৃত কার্যক্রম রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞতা ও বিদ্যমান বিনিয়োগ কাজে লাগিয়ে নতুন শিল্প উদ্যোগের পাশাপাশি চলমান শিল্প অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সার উৎপাদন ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও কার্যকর করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের বিনিয়োগের গুরুত্ব শুধু অর্থের সংস্থানেই সীমাবদ্ধ নয়। নতুন শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, স্থানীয় কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
জাইকার সঙ্গে বৈঠকে উন্নয়ন প্রকল্প ও ঋণসহায়তা
দিনের শেষ গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি হয় জাইকার প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকার সঙ্গে। বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে অনুষ্ঠিত সৌজন্য সাক্ষাতে বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে জাপানের সহায়তায় চলমান বড় প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করা এবং অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এ বৈঠকে বাংলাদেশের জন্য সহজ শর্তে ঋণসহায়তা অব্যাহত রাখা এবং কারিগরি সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রত্যাশা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ-জাপান দক্ষতা উন্নয়ন অংশীদারত্ব, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন নগরী প্রতিষ্ঠা, কৃষির আধুনিকায়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং হালকা প্রকৌশল খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়।
জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বাজেট সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ। জাইকার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের সমৃদ্ধি অর্জনে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। আজ বৈঠকঃ আজ মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় টোকিও’তে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কান্তেইয়ে’ এই বৈঠক হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপ প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন বলেন, ‘‘ মঙ্গলবার জাপানের প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বি-পক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে নেতৃত্ব দেবেন।”
‘‘ বৈঠকে দুই দেশের মধ্যকার দ্বি-পক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, ব্যবসা-বানিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন খাতে জাপানের সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দুইদেশের অবস্থান নিয়ে আলোচনা হবে।”
জাপানেরর প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে সোমবার সকালে তারেক রহমান চার দিনের সফরে টোকিও আসেন তারেক রহমান। টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসে পৌঁছালে তাকে অভ্যর্থনা জানান জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নাকাসোনে ইয়াসুতাকা (NAKASONE YASUTAKA) । এ সময় তার স্ত্রীও সাথে ছিলেন ।
প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব বলেন, ‘‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে আজকে অভ্যর্থনা জানাবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী । এরপর দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দ্বি-পাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক হবে।”
‘‘ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন।”
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিনিধি দলে রয়েছেন, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন (আশিক চৌধুরী), বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর মো. মোস্তাকুর রহমান, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক বিশেষ সহকারি শাকিরুল ইসলাম খান, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, সচিব সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী, পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের অর্থনৈতিক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী ও আম জনতা দলের সাধারণ সম্পাদক মো. তারেক রহমান। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেয়া মধ্যহ্ন ভোজে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পরে বিদেশে এটি হচ্ছে তারেক রহমানের তৃতীয় রাষ্ট্রীয় সফর। জাপান সফরের আগে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়া এবং চীন সফর করেছিলেন। জাতিসংঘের ৮১ তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন যোগ দিতে গত সেপ্টম্বরে নিউইয়র্ক সফর করেন প্রধানমন্ত্রী।
