আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে শুধু দলের নামের পার্থক্য, চরিত্র একই বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি অভিযোগ করেন, আগে যেভাবে চাঁদাবাজি, খুন, দখলদারি এবং হাট, বাজার, স্কুল, বালুঘাট ও পরিবহন স্ট্যান্ডের কমিটি নিয়ে প্রভাব বিস্তারের ঘটনা ঘটত, এখনো তা চলছে। শুধু দলের নাম বদলেছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ আয়োজিত রক্তে ভেজা ২৮ অক্টোবর, ফ্যাসিবাদের উত্থান: কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ বিনির্মাণের চ্যালেঞ্জ ও করণীয় শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হলেও ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তা প্রত্যাহার করে নেয় এবং মামলার নথিপত্রও নিখোঁজ হয়ে যায় বলে তিনি অভিযোগ করেন। ওই ঘটনায় নিহতদের মায়েরা এখনো বিচারের জন্য অপেক্ষা করছেন।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে সত্যিই খুনি ও ফ্যাসিবাদী মনে করলে ২৮ অক্টোবরের মামলা পুনরুজ্জীবিত করে অপরাধীদের গ্রেফতার করতে হবে।
বিএনপি ও আওয়ামী লীগ ক্ষমতার রাজনীতি থেকে ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটতে শিখেছে বলে মন্তব্য করেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি এখন একই পথে এগোচ্ছে। নির্বাচনের আগে তারেক রহমান গণভোটে হ্যাঁ ভোট চাইলেও ক্ষমতায় গিয়ে সেই অবস্থানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তাঁর দাবি, একই দিনে অনুষ্ঠিত দুটি ভোটের একটিকে মেনে অন্যটি না মেনে সংস্কার ও সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে বিরোধী দলকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, সহস্রাধিক মানুষের আত্মত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্র গঠনের যে স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষমতায় যাওয়ার পর গণতন্ত্রের কথা ভুলে যাওয়ার প্রবণতাই ফ্যাসিবাদের পথ তৈরি করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন বিএনপিকে জোটের শরিকদের সঙ্গে যৌথ সমাবেশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন গোলাম পরওয়ার। তাঁর ভাষ্য, বিএনপি সেই প্রস্তাবে সম্মত না হয়ে পৃথক সমাবেশের সিদ্ধান্ত নেয়।
সেদিনের সহিংসতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, উত্তর গেটে হামলার ঘটনা ঘটলেও নয়াপল্টনে কীভাবে নির্বিঘ্নে সমাবেশ চলেছিল। তাঁর অভিযোগ, একদিকে মানুষকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে, অন্যদিকে আরেকটি সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। সে সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ, র্যাব, বিডিআর ও সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনী সক্রিয় থাকলেও সহিংসতা ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসের সমালোচনা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, দলটি ক্ষমতার বাইরে থাকলে গণতন্ত্রের কথা বলে, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে গণতন্ত্র সংকুচিত করে। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তানের শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, স্বাধীনতার পর শেখ মুজিব ক্ষমতায় এসে বাকশাল প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ এবং সংবাদপত্র বন্ধের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করেছিলেন। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনার শাসনামলেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, রাজনীতিতে অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতার সূচনা শুধু ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনা দিয়ে নয়; পরবর্তী সময়ে দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ২০১৮ সালের নির্বাচন এবং দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনামলের মধ্য দিয়ে এর ধারাবাহিকতা দেখা গেছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচিত সংসদ ও সংসদীয় গণতন্ত্রের আড়ালে কর্তৃত্ববাদী শাসন চালিয়েছে। জামায়াত নেতাদের ফাঁসি, দলীয় কার্যালয়ে তালা, বিরোধীদের দমন, গুম ও নির্যাতনের মতো ঘটনা তারই অংশ ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, তরুণদের নেতৃত্বে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এবং সর্বস্তরের মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান ঘটে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ একই সূত্রে গাঁথা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
হামিদুর রহমান আযাদ আরও অভিযোগ করেন, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আচরণে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া সংস্কারমূলক উদ্যোগগুলোর অনেক কিছু বিএনপি ক্ষমতায় এসে বাতিল করেছে। তাঁর দাবি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনকে দলীয় প্রভাবাধীন করেছিল বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, বিএনপিও সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বাতিল করেছে।
সেমিনারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ড. আব্দুল মান্নান প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
