ইরানের বাধা ও হুমকি সত্ত্বেও গত জুন থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো ১৫০ কোটি ব্যারেলের বেশি জ্বালানি তেল রপ্তানি করেছে। এ ক্ষেত্রে সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, গত ছয় মাসে তাদের সহায়তায় ৩ হাজারের বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ইরানের হুমকি থাকা সত্ত্বেও এই নৌপথ দিয়ে চলাচলকারী ৯৫ শতাংশের বেশি জাহাজ নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছেছে। আল জাজিরা-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
সেন্টকমের দাবি, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা ভূমিকা রাখছে। সংস্থাটি বলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজ চলাচলের এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদারদের হাতে রয়েছে।
সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের অঞ্চলটি সফরকালে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। গতকাল মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে তিনি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেন। এক বিবৃতিতে কুপার বলেন, ‘আমরা উপসাগরীয় অংশীদার ও নৌপরিবহন শিল্পের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ নৌ চলাচল অব্যাহত রাখার বিষয়ে আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন এই সফর।’ কুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, মাইন অপসারণে নিয়োজিত কর্মীদের ‘অসাধারণ প্রচেষ্টার’ কারণে প্রণালির জাহাজ চলাচলের প্রধান পথগুলো ইরানের পেতে রাখা মাইনমুক্ত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সচল রাখতে আমরা নিবিড়ভাবে কাজ করছি। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) এবং নৌপরিবহন শিল্পের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে।’
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। তেহরান এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানোর পাশাপাশি একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ের কাছাকাছি ফিরে এসেছে। বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রতিদিন অন্তত ১ কোটি ৬৫ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল রপ্তানি হয়েছে। ইরানের রপ্তানি বাদ দিলে এ পরিমাণ যুদ্ধের আগের গড় সরবরাহের সমান। বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর, মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিরাপত্তা পাহারা এবং তেল পরিবহনে পাইপলাইনের ব্যবহার বাড়ানোর সম্মিলিত প্রভাবে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
তবে তেল সরবরাহ আগের পর্যায়ে ফিরতে শুরু করলেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানিটির দাম এখনো যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় অনেক বেশি। গতকাল ব্রেন্ট ক্রুডের ভবিষ্যৎ সরবরাহের চুক্তির দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৪ ডলার ৫০ সেন্টে দাঁড়ায়। গত সপ্তাহে প্রায় ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর দামটি প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার ৪৮ সেন্টে স্থির হয়েছিল। এর পরদিনই ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তেলের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি করে। সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানি বাড়লেও সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংঘাতের গতিপ্রকৃতি বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।
