ব্যক্তিগত ভাবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মনে করেন, স্কুল স্তরে পাশ-ফেল চালু হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা জগতের অনেকেই মনে করেন, সাময়িক ভাবে পাশ-ফেল পদ্ধতি চালু হওয়া উচিত। তবে বেশ কিছু শর্ত পূরণও আবশ্যিক।
শিক্ষকদের একাংশের দাবি, পড়ুয়াদের ফেল করিয়ে দেওয়াই প্রাথমিক উদ্দেশ্য হতে পারে না। কিন্তু শিক্ষার সার্বিক উন্নতি, মানোন্নয়ের জন্যই এই বিচারের প্রয়োজন। তবে সে জন্য অবশ্যই নির্দিষ্ট মাপকাঠি প্রয়োজন। যদিও শিক্ষকদের অনেকে মনে করেন প্রাথমিক বা উচ্চপ্রাথমিকে পাশ-ফেল থাকার প্রয়োজন নেই।
রবিবার মেদিনীপুরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘সিলেবাস কমিটির সুপারিশ সরকার মানবে, জাতীয় শিক্ষানীতি রয়েছে। তাই রিপোর্ট আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। সংশ্লিষ্ট দফতরের মন্ত্রীরা শিক্ষিত মানুষ। তাঁদের সিদ্ধান্ত নিতে দিন। তবে ব্যক্তিগত ভাবে যদি আমাকে বলেন তা হলে আমি বলব, স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করা এবং পাশ ফেল প্রথা ফিরিয়ে আনা উচিত।’’ এর পরই শিক্ষকদের একাংশ এই পদক্ষেপ গ্রহণের আর্জি জানাচ্ছেন।
শিক্ষকমহলের একাংশের দাবি, ২০১১ সালে শিক্ষার সামগ্রিক উন্নতি না করেই পাশ-ফেল প্রথা তুলে দেওয়া হয়েছিল। তার ফলে গোটা স্কুলশিক্ষায় বিপর্যয় নেমেছে দাবি। এর পরিবর্তন চাইছেন শিক্ষকেরা। তবে, তাঁরাই মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শিক্ষাব্যবস্থার আমূল উন্নয়ন প্রয়োজন। তা না করে, হঠাৎ পাশ-ফেল প্রথা ফিরিয়ে আনলে, স্কুলছুটের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
২০০৯ সালের শিক্ষার অধিকার আইনে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি এই পাশ-ফেল প্রথার অবলুপ্তি ঘটে। ২০১০-এর এপ্রিল থেকে তা কার্যকর হয়। এ রাজ্যে তা চালু হয় ২০১১ সালের ডিসেম্বর থেকে। এ প্রসঙ্গে নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুজিত দাস বলেন, “সব স্কুলের পরিকাঠামো, ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ও শিক্ষা পরিকাঠামোর উন্নতি এবং পাঠ্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। আমরা মনে করি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাশ-ফেল না থাকাই উচিত। কিন্তু সে জন্য কিছু নির্দিষ্ট মাপকাঠিতে স্কুলের উন্নতি করা প্রয়োজন। যত দিন তা না করা যায়, ততদিন পর্যন্ত পাশ ফেল প্রথা স্কুলে চালু রাখা হোক।”
সুজিত জানান, স্কুলের সার্বিক উন্নয়নের সঙ্গেই যেন পাশ-ফেল প্রথা চালু হয়। তাঁর দাবি, ২০১১ সালে তৎকালীন রাজ্য সরকারের কাছে অনুরোধ করা হয়েছিল, স্কুলের সার্বিক উন্নতি না করে পাশ-ফেল প্রথা তুলে দিলে বিপর্যয় হতে পারে। বাস্তবে তেমনই ঘটেছে বলে সুজিতের মত। তাই তাঁরা চান, পাশ-ফেল প্রথা ফিরিয়ে এনে শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়ন করা হোক। কয়েক বছর পরে যখন এই শিক্ষার মান একটি ছন্দে ফিরবে, তখন পাশ ফেল প্রথা তুলে দেওয়া যেতে পারে।
যে সব উন্নত দেশে পাশ ফেল নেই সেখানে ছাত্র শিক্ষক অনুপাত ২২ জন ছাত্র পিছু ১ জন শিক্ষক। এ রাজ্যে সেটা ৪০ জন ছাত্র পিছু একজন শিক্ষক। তাই এই বিষয়টিও সরকারের ভাব উচিত। শিক্ষার খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির কথাও বলেন তিনি।
একই ভাবে মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা সম্পাদক অনিমেষ হালদারও মনে করেন কোনও একটি মাপকাঠি না থাকলে শিক্ষার মানের আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। অল ইন্ডিয়া ফেডারেশন অফ এডুকেশনাল অ্যাসোসিয়েশন-এর সাধারণ সম্পাদক নবকুমার কর্মকারের মত, শিক্ষার অধিকার আইনের উদ্দেশ্য হল স্কুলছুট বন্ধ করা এবং পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের স্কুলমুখী করে সার্বিক উন্নতি করা। পাশ ফেল চালু করে স্কুলছুট যেন না বৃদ্ধি পায় সেটাও মনে রাখতে হবে। তাঁরাও মনে করেন, পাশ-ফেল ফিরুক কিন্তু কোনও ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে যেন অন্যায় না করা হয়।
শিক্ষানুরাগী ঐক্যমঞ্চের সাধারণ সম্পাদক কিংকর অধিকারী অবশ্য মনে করেন শিক্ষার সর্বিক উন্নতি হলে পাশ-ফেল এই শব্দই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। সরকারের সেই লক্ষ্যে কাজ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘‘প্রথম শ্রেণি থেকেই সকলকে পাশ করিয়ে দেওয়ার নীতির পরিবর্তে পর্যাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী নিয়োগ ও আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। যাতে সার্বিক ভাবে পঠনপাঠনের মান বৃদ্ধি হয় এবং অনুত্তীর্ণের সংখ্যা কমে।” তাঁর দাবি, পড়ুয়ারা যেন কাঙ্ক্ষিত মানে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
যদিও বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল মনে করেন পাশ-ফেল প্রথা ফিরিয়ে আনলে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের সঙ্গেই অন্যায় করা হবে। তাঁর দাবি, “এমনকি কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ২০১৯ সালে শিক্ষার অধিকার আইন সংশোধনে পুরো ফেল করানোর সুপারিশ করেনি। অধিকাংশ বিজেপি শাসিত রাজ্য ও শিক্ষায় এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলিতেও পাশ-ফেল চালু করেনি কেন?”
এ বিষয়ে অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক বাপি প্রামাণিক জানান, সংশোধিত শিক্ষার অধিকার আইন এবং জাতীয় শিক্ষানীতির আদলে পঞ্চম এবং অষ্টমে পাশ-ফেল প্রথা ফেরানোর প্রস্তাব দেওয়া হবে। তাঁর কথায়, “ওই দুই ক্লাসে কোনও পড়ুয়া ফেল করলে ফের তাঁকে সুযোগ দেওয়ার আবেদন করা হবে। তার পরও যদি পাশ করতে না পারে তা হলে তাকে ওই ক্লাসেই রেখে দেওয়া হবে।” পাশাপাশি তাঁর মত, পাশ-ফেল কথাটাই ঠিক নয়। এটা মূল্যায়ন পদ্ধতির অংশ। সকলকেই পাশ করাতে শিক্ষকদেরই দায়িত্ব নিতে হবে।
