ব্ল্যাক রাইস বা কালো চাল নামটা এখন আর আমাদের কাছে খুব একটা অচেনা নয়। এশিয়ার অনেক দেশেই ঐতিহ্যগতভাবে কালো বা কালচে-বেগুনি ধানের চাষ হয়ে আসছে। বাংলাদেশেও এর চাষ হতো, তবে মূল বাধাটা ছিল ফলনে। ফিলিপাইনের আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) একটি গবেষণায় দেখা যায়, রঙিন এসব ধানের ফলন হেক্টরপ্রতি মাত্র ২ থেকে ৩ টন। ফলন কম হওয়ায় বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এর সরবরাহ ছিল একেবারেই সীমিত। স্বভাবতই দামও ছিল সাধারণের নাগালের বাইরে। ফলে পুষ্টিগুণে ভরপুর এই চাল কেবল উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্তদের খাবার টেবিলেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে এবার সেই চিত্র বদলাতে যাচ্ছে!
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) সম্প্রতি উদ্ভাবন করেছে ‘ব্রি ধান১১৫’। এটিই বাংলাদেশের প্রথম উচ্চ ফলনশীল কালো চালের জাত, যা ভিটামিন-ই এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। এটি শুধু নতুন ধানের জাতই নয়, বরং দেশের কৃষিকে পুষ্টিসমৃদ্ধ ও বাজারমুখী করার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ৫ ফেব্রুয়ারি কৃষি মন্ত্রণালয়ে জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় এই জাতটি সারা দেশে চাষাবাদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হয়েছে।
ভিটামিন-ই এর নাম তো আমরা হরহামেশাই শুনি, কিন্তু শরীরে এর জাদুকরি উপকারিতাগুলো কি জানা আছে? ভিটামিন-ই বা টোকোফেরল মূলত চর্বিতে দ্রবণীয় একধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এটি আমাদের শরীরের কোষগুলোকে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যাল বা মুক্ত অণুর হাত থেকে রক্ষা করে। শুধু তা-ই নয়, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী করার পাশাপাশি ধমনিতে রক্ত জমাট বাঁধতেও বাধা দেয়।
ভিটামিন-ই বা টোকোফেরল মূলত চর্বিতে দ্রবণীয় একধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এটি আমাদের শরীরের কোষগুলোকে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যাল বা মুক্ত অণুর হাত থেকে রক্ষা করে।
এই ভিটামিন ত্বকের লাবণ্য ধরে রাখে, কোষ পুনর্গঠনে সাহায্য করে, চুলের বৃদ্ধি ঘটায় এবং স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কাজ সচল রাখে। শরীরে এর ঘাটতি দেখা দিলে পেশির দুর্বলতা, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, হাত-পায়ে অসাড়তা বা তীব্র ক্লান্তি ভর করতে পারে। পুষ্টির এই বিশাল ঘাটতি মেটাতেই ব্রি উদ্ভাবন করেছে ভিটামিন-ই বা টোকোফেরলযুক্ত নতুন জাত ‘ব্রি ধান১১৫’।
ব্রির বায়োটেকনোলজি বিভাগের বিজ্ঞানীরা অ্যান্থার কালচার নামের এক বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে দেশের প্রথম উচ্চ ফলনশীল এই কালো ধানের জাতটি উদ্ভাবন করেছেন। সহজ করে বললে, এই পদ্ধতিতে পরাগধানী থেকে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে চারা তৈরি করা হয়। এতে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যের স্থিতিশীল জাত অপেক্ষাকৃত খুব কম সময়েই পাওয়া যায়। এই জাতের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ৭.৪ টন এবং এর জীবনকাল ১৩৭ থেকে ১৪২ দিন। এর ধানগুলো বেশ লম্বা ও চিকন।
ধানের বাইরের খোসার রং কালচে বাদামি হলেও ভেতরের চালটি একেবারে কালো রঙের। ১ হাজারটি পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ১৭.৮ গ্রাম আর এতে অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৩ শতাংশ। পুষ্টিগুণের দিক থেকেও এটি অনন্য! এর প্রতি কেজি চালে ভিটামিন-ই রয়েছে প্রায় ১৫ মিলিগ্রাম এবং সায়ানিডিন-৩-গ্লুকোসাইড (C3G) আছে ২৯.১২ মিলিগ্রাম। এ ছাড়া প্রতি ১০০ গ্রাম চালে ৫৩৬.৬১ মাইক্রোমোল এএই (µM AAE) পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যায়।
ধানের বাইরের খোসার রং কালচে বাদামি হলেও ভেতরের চালটি একেবারে কালো রঙের। ১ হাজারটি পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ১৭.৮ গ্রাম আর এতে অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৩ শতাংশ।
এই চালের বাইরের খোসা বা স্তরে প্রচুর পরিমাণে ‘অ্যান্থোসায়ানিন’ থাকে, যা ক্যানসার প্রতিরোধে দারুণ কার্যকর। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, আমাদের রোজকার সাধারণ সাদা চালের তুলনায় এই কালো চালে আমিষ, ফাইবার (আঁশ), ভিটামিন-ই এবং নানা খনিজ পদার্থ প্রায় তিন গুণ বেশি থাকে!
কৃষকের কাছে নতুন জাত মানেই হলো তার ভালো ফলন আর জীবনকালের হিসাব। সেখানে ‘ব্রি ধান১১৫’ এক দারুণ চমক! হেক্টরপ্রতি ৭.৪ টন ফলন দেওয়া এই জাত ঐতিহ্যবাহী দেশি জাতগুলোর চেয়ে অনেক বেশি উৎপাদনশীল। তাই বাণিজ্যিকভাবে এটি কৃষকদের জন্য বিশাল লাভের দুয়ার খুলে দিতে পারে। পুষ্টির দিক থেকে কালো চালের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি হোল গ্রেইন বা পূর্ণাঙ্গ শস্য। অর্থাৎ এতে তুষ বা কুঁড়ার স্তরটি অক্ষত থাকে।
সাদা চাল মেশিনে পালিশ করার সময় এই স্তরের সঙ্গেই এর সবচেয়ে মূল্যবান পুষ্টিগুণ হারিয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, কালো চালে সাদা চালের চেয়ে প্রোটিন ও আঁশ যেমন বেশি, তেমনি আয়রনের পরিমাণও অনেক বেশি। প্রতি ১০০ গ্রাম শুকনো সাদা চালে যেখানে আঁশ থাকে মাত্র ০.৪ গ্রাম, সেখানে কালো চালে এর পরিমাণ প্রায় ৪.৯ গ্রাম! অবশ্য জাতভেদে এই হিসাবে কিছুটা এদিক-ওদিক হতে পারে।
হেক্টরপ্রতি ৭.৪ টন ফলন দেওয়া ব্রি ধান১১৫ জাত ঐতিহ্যবাহী দেশি জাতগুলোর চেয়ে অনেক বেশি উৎপাদনশীল। তাই বাণিজ্যিকভাবে এটি কৃষকদের জন্য বিশাল লাভের দুয়ার খুলে দিতে পারে।
বেশি আঁশ থাকার আরেকটি চমৎকার সুবিধা হলো রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকা। ল্যাবরেটরির গবেষণায় দেখা গেছে, কালো চালের তুষ আমাদের হজমের গতি কিছুটা কমিয়ে দেয়, যা গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) বা রক্তে চিনি মেশার হার কমাতে বেশ সাহায্য করে। বাংলাদেশ এখন ডায়াবেটিস ও স্থূলতার বড় ঝুঁকিতে আছে, তাই এমন চাল আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। এর আগে ব্রি ‘ব্রি ধান১০৫’ নামে লো-জিআই (৫৫ বা তার কম) সম্পন্ন একটি জাত এনেছিল। অর্থাৎ, বিজ্ঞানীরা এখন শুধু আমাদের পেট ভরানোর কথাই ভাবছেন না, বরং খাবারের মাধ্যমে যেন আমরা সুস্থ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ থাকি, সেদিকেও গভীর মনোযোগ দিচ্ছেন।
আমাদের প্রতিদিনের খাবারে ভিটামিন-ই-এর উৎস কিন্তু বেশ সীমিত। সেখানে রোজকার প্রধান খাবার ভাতের মাধ্যমেই যদি এই জরুরি ভিটামিনটি পাওয়া যায়, তবে তা সাধারণ মানুষের জন্য অনেক বড় পাওয়া। তবে একটা ব্যাপার পরিষ্কার থাকা ভালো—ভিটামিন-ই এর একমাত্র উৎস হিসেবে শুধু চালের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। কালো চাল হলো সুষম খাদ্যের একটি দারুণ পরিপূরক, সম্পূর্ণ বিকল্প নয়। এই চালের আকর্ষণীয় কালো রংটি আসে অ্যান্থোসায়ানিন নামের এক বিশেষ রঞ্জক থেকে। এটি শুধু রংই ছড়ায় না, এর শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণ আমাদের শরীরের ক্ষতিকর মুক্ত অণুগুলোর বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ করে। এই মুক্ত অণুগুলোই দীর্ঘমেয়াদে কোষের ক্ষতি করে বার্ধক্য ডেকে আনে এবং ক্যানসারের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
একটা ব্যাপার পরিষ্কার থাকা ভালো—ভিটামিন-ই এর একমাত্র উৎস হিসেবে শুধু চালের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। কালো চাল হলো সুষম খাদ্যের একটি দারুণ পরিপূরক, সম্পূর্ণ বিকল্প নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, কালো চালের এই উপকারী ফেনলিক ও অ্যান্থোসায়ানিন উপাদানগুলোর বড় অংশই (যথাক্রমে ৭৩% ও ৯১%-এর বেশি) জমা থাকে এর ওপরের তুষ বা আবরণীতে। এর সোজা অর্থ হলো—এই চাল মেশিনে বেশি পালিশ করে চকচকে করলেই এর জাদুকরি স্বাস্থ্যগুণ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে!
বিশ্বজুড়েই কালো চালের বাজার বেশ চড়া, যাকে বলা যায় প্রিমিয়াম মার্কেট। বাণিজ্যিক হিসাব বলছে, সাধারণ লালচে বা বাদামি চালের তুলনায় কালো চালের দাম তিন থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। বাংলাদেশের বাজারে এর এত কদরের পেছনে অন্তত চারটি কারণ আছে। প্রথমত, শহুরে মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিস ও স্থূলতা নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে, তাই তাঁরা বেশি আঁশযুক্ত ও কম জিআই সম্পন্ন খাবারের জন্য একটু বেশি দাম দিতেও রাজি।
দ্বিতীয়ত, সুপারশপ ও অনলাইন বাজারগুলোতে ‘স্বাস্থ্যকর চাল’ এখন আলাদা একটি জনপ্রিয় ক্যাটাগরি হয়ে উঠেছে। তৃতীয়ত, দেশেই এই চাল উৎপাদিত হলে বিদেশ থেকে কালো চাল আমদানির নির্ভরতা কমবে। আর সবশেষে, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং এশিয়ান স্বাস্থ্যখাদ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে এই চাল রপ্তানির বিশাল সুযোগ রয়েছে। কৃষকদের কাছেও এটি দারুণ লাভজনক। হেক্টরপ্রতি ৭.৪ টন ফলন যদি সাধারণ চালের চেয়ে বহুগুণ বেশি দামে বিক্রি করা যায়, তবে কৃষকের মুখে হাসি ফুটতে বাধ্য!
বিশ্বজুড়েই কালো চালের বাজার বেশ চড়া, যাকে বলা যায় প্রিমিয়াম মার্কেট। বাণিজ্যিক হিসাব বলছে, লালচে বা বাদামি চালের তুলনায় কালো চালের দাম তিন থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
এত সব সম্ভাবনার ভিড়ে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও উঁকি দিচ্ছে। প্রথমত, চড়া দামের কারণে সাধারণ মানুষের প্লেটে এই চাল পৌঁছানো একটু কঠিন হতে পারে; তবে উৎপাদন বাড়লে দাম এমনিতেই কমে আসবে। দ্বিতীয়ত, কালো চালের স্বাদ, গন্ধ আর রান্নার নিয়মকানুন আমাদের রোজকার সাধারণ ভাতের চেয়ে কিছুটা আলাদা। তাই মানুষকে এই চালে অভ্যস্ত করতে বিভিন্ন মজার রেসিপি প্রচারের পাশাপাশি স্কুল বা হাসপাতালের খাদ্যতালিকায় এটি পরীক্ষামূলকভাবে যুক্ত করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, কোনোভাবেই চাল প্রক্রিয়াজাত করার সময় অতিরিক্ত পালিশ করা যাবে না, নইলে পুষ্টিগুণ শেষ!
চতুর্থত, বেশি লাভের আশায় বাজারে রং মেশানো ভেজাল কালো চাল ঢুকে পড়ার ঝুঁকি আছে। এ জন্য জাতের নাম উল্লেখ করে সঠিক ব্র্যান্ডিং এবং মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করাটা খুব জরুরি। সবশেষে, কৃষকদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক চাষ, সঠিক উপায়ে গুদামজাত করা এবং বাজারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কৃষক, উদ্যোক্তা ও ব্রির মধ্যে শক্ত একটি সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।
বেশি লাভের আশায় বাজারে রং মেশানো ভেজাল কালো চাল ঢুকে পড়ার ঝুঁকি আছে। এ জন্য জাতের নাম উল্লেখ করে সঠিক ব্র্যান্ডিং এবং মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করাটা খুব জরুরি।
আধুনিক কৃষি গবেষণার লক্ষ্য এখন কেবল ফলন বাড়ানোতেই আটকে নেই; বরং পুষ্টি, ভোক্তার সুস্থতা আর কৃষকের অর্থনৈতিক লাভ—এই তিনটিকে এক সুতোয় গাঁথতে চাইছেন বিজ্ঞানীরা। উচ্চ ফলন, ভিটামিন-ই আর অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের এক দারুণ প্যাকেজ ‘ব্রি ধান১১৫’ জাতটি আমাদের পুষ্টি-সংবেদনশীল কৃষির জন্য এক অভাবনীয় অর্জন। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে ভালো বীজের সরবরাহ, কৃষকদের সঠিক প্রশিক্ষণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার কাজগুলো একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। কেবল তখনই এই পুষ্টিকর কালো চাল আর শুধু শহুরে সুপারশপের তাকে বন্দী না থেকে, আমাদের দেশের কৃষি-অর্থনীতি আর সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য সত্যিকারের এক সম্পদ হয়ে উঠবে।
