গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আত্মপ্রকাশের সময় নিজেদের গণতান্ত্রিক ও মধ্যপন্থি দল হিসেবে পরিচিত করেছিল। গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার, বহুত্ববাদ ও বিভাজনমুক্ত রাজনীতির অঙ্গীকার নিয়ে দলটি প্রচলিত রাজনৈতিক মেরুকরণের বাইরে নতুন ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় জানিয়েছিল; কিন্তু আত্মপ্রকাশের এক বছরের বেশি সময়ের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট ও রাজনৈতিক সমঝোতা দলটির সেই আদর্শিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষকে নিয়ে গঠিত দলটির সাংগঠনিক বিস্তার ঘটলেও নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় কতটা স্বাতন্ত্র্য, তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করতে গিয়ে এনসিপি ক্রমেই জামায়াতের প্রভাববলয়ে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। যদিও দলটির নেতারা বলছেন, জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও আদর্শিক অবস্থান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে এনসিপি স্বাধীন। ফলে মধ্যপন্থার দাবি বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দলীয় ইশতেহার, নীতিনির্ধারণ ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তার প্রতিফলন ঘটানোই এখন এনসিপির বড় চ্যালেঞ্জ। স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে নতুন ধারার রাজনীতি গড়ার যে প্রত্যাশা নিয়ে দলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের মতে, এনসিপির সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু সাংগঠনিক বিস্তার বাড়ানো নয়, বরং নিজস্ব আদর্শ ও রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা। বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষকে এক ছাতার নিচে রাখা এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও স্বাধীন অবস্থান ধরে রাখার সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে দলটির ভবিষ্যৎ। মধ্যপন্থার রাজনীতি যদি এনসিপির প্রকৃত আদর্শ
হয়, তবে সেই পরিচয়ের প্রমাণ দিতে হবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কর্মকা-ে।
এনসিপির আত্মপ্রকাশের সময় সাধারণের প্রত্যাশা ছিল, দলটি প্রচলিত রাজনৈতিক মেরুকরণের বাইরে গিয়ে নতুন একটি রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করবে। বিভিন্ন মতাদর্শ ও শ্রেণি-পেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে নাগরিক অধিকার, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠবে তারা। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আত্মপ্রকাশের সময় দলটি নিজেদের ‘গণতান্ত্রিক ও মধ্যপন্থি’ হিসেবে ঘোষণা করে। একই সঙ্গে জাতিগত, সামাজিক, লিঙ্গীয়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা এবং মৌলিক অধিকার সুরক্ষার অঙ্গীকার করে।
দলের সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম মধ্যপন্থা ও বাংলাদেশপন্থাকে দলটির রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলোকে এ মুহূর্তে দলীয় রাজনীতির কেন্দ্রে রাখতে চায় না এনসিপি। ইসলামবিদ্বেষী রাজনীতি কিংবা উগ্র ইসলামপন্থা ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিÑ কোনোটিকেই নিজেদের অবস্থান হিসেবে দেখতে চায় না দলটি।
এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য এবং দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার আমাদের সময়কে বলেন, এনসিপির রাজনীতির প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে যেসব রাজনৈতিক দল অপপ্রচার চালাচ্ছে, যারা বিগত সময়গুলোয় গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানুষের অধিকার আদায়ে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তারাই এখন এনসিপিকে বাম-ডান এবং ডান-বাম বলে বিতর্ক সৃষ্টি করে জনমনে বিভ্রান্ত করতে পাঁয়তারা করছে। তিনি বলেন, মধ্যপন্থা বলতে আমরা বিভাজিত রাজনীতির অবসানকে বুঝি, যেখানে কেউ কাউকে খারিজ করে দেবে না। আমরা বাম-ডান এমন যে বিভাজন আছে, সেগুলোয় ঢুকতে চাই না। আমরা বাংলাদেশ প্রশ্নে এক থাকতে চাই।
এরই মধ্যে বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াত ঘরানার সংগঠন থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির এনসিপিতে যোগদান দলটির সাংগঠনিক পরিসর বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ভিন্ন রাজনৈতিক পটভূমি থেকে আসা নেতাদের নিয়ে অভিন্ন আদর্শিক অবস্থান গড়ে তোলার প্রশ্নও সামনে এসেছে। জামায়াতের সঙ্গে জোট ও রাজনৈতিক সমঝোতা যুক্ত হওয়ায় এনসিপির মধ্যপন্থার দাবির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।
এদিকে এনসিপির নেতারা অবশ্য জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ককে নিজেদের আদর্শিক অবস্থানের পরিপন্থি বলে মনে করেন না। সারজিস আলম বলেন, বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিন জোটবদ্ধ রাজনীতি করলেও কোনো দলই অন্য দলের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়নি। একইভাবে এনসিপিও জামায়াতের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে একাকার হয়ে যাবে না। তার মতে, জামায়াত ধর্মভিত্তিক ডানপন্থার রাজনীতি করে, আর এনসিপির অবস্থান মধ্যপন্থায়। ফলে দুই দলের মধ্যে আদর্শিক পার্থক্য রয়েছে। নিজেদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদাহরণ হিসেবে সংসদে জামুকা বিল পাসের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন সারজিস আলম। তার ভাষ্য, ওই বিলে এনসিপি নিজেদের বিবেচনা অনুযায়ী সমর্থন দিয়েছে; জামায়াত কী ভাববে, তা বিবেচনায় নেয়নি। অর্থাৎ, রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্য দলের ওপর নির্ভরশীল নয় এনসিপিÑ এমনটাই বোঝাতে চান দলের নেতারা।
তবে দলটির এই ব্যাখ্যায় পুরোপুরি আশ্বস্ত নন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সারোয়ার জাহান। তিনি বলেন, এনসিপির আত্মপ্রকাশের সময় মধ্যপন্থার যে ধারণা সামনে এসেছিল, তা এখন অনেকটাই অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। জামায়াতের সঙ্গে জোটসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে দলটিকে মধ্যপন্থি হিসেবে দেখার সুযোগ কমেছে। তিনি মনে করেন, একটি রাজনৈতিক দলের আদর্শিক অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য সুনির্দিষ্ট ইশতেহারও জরুরি। দীর্ঘ সময় পার হলেও এনসিপি ইশতেহার প্রকাশ করতে না পারায় দলটির রাজনৈতিক লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে দোলাচল রয়ে গেছে।
আরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদের মতে, সাংগঠনিক ভিত্তি ও নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত হওয়ার আগেই কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়লে নতুন দলের স্বতন্ত্র পরিসর গড়ে তোলার সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এনসিপির সংসদ সদস্যরা জামায়াতের সমর্থনেই নির্বাচিত হয়েছেনÑএমন ধারণা জনপরিসরে তৈরি হওয়াও দলটির জন্য চ্যালেঞ্জ। তার আশঙ্কা, জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হলে এনসিপির নিজস্ব ভোটভিত্তি ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে জামায়াতের সঙ্গে জোট করলেই এনসিপি ডানপন্থি হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে দলটির নীতিগত অবস্থান, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে মধ্যপন্থার দাবি কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও চলবে না। সেই অবস্থানের প্রতিফলন থাকতে হবে দলীয় ইশতেহার, নীতিনির্ধারণ ও রাজনৈতিক কর্মকা-ে।
