অক্টোবর ২৮, ২০২৬ ৯:০১ পূর্বাহ্ণ
এক সময়ের প্রমত্তা হুইসেল আর ছক্ছক্ শব্দের ঝংকার আজ কেবলই স্মৃতির পাতায় বন্দি। ব্রিটিশ আমলের ঐতিহ্যবাহী বাগেরহাট-রূপসা রেলপথে এখন আর চলে না ট্রেন; রেলপথের না আছে চিহ্ন, না আছে কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব। ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ঐতিহাসিক রেললাইনের জমিতে এখন কোথাও গড়ে উঠেছে পিচঢালা সড়ক, কোথাও অবৈধ দখলদারদের পাকা বসতবাড়ি ও নানা স্থাপনা, আবার কোথাও তা ঢাকা পড়েছে ঝোপঝাড় ও বোন জঙ্গলে। দীর্ঘ প্রায় ১০৮ বছরের এই প্রাচীন রেলযোগাযোগ ফিরিয়ে আনতে এবং বেদখল হওয়া সম্পত্তি উদ্ধার করতে এখন ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বলছে, ১৯১৮ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে বাগেরহাট শহরের নাগেরবাজার থেকে খুলনার পূর্ব রূপসা পর্যন্ত প্রায় ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ নির্মিত হয়েছিল। মূলত যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি তৎকালীন সময়ে ব্যবসায়িক মালামাল ও কৃষিপণ্য আনা-নেওয়ার প্রধান চালিকাশক্তি ছিল এই রুট। শুরুতে কয়লাচালিত ইঞ্জিনের টানে ১৩টি যাত্রীবাহী কোচ ও আটটি মালবাহী গাড়ি এই পথে চলাচল করত। স্বাধীনতার পর রূপসা-বাগেরহাট রেললাইনটি ব্রডগেজে উন্নীত করে ডিজেলচালিত ইঞ্জিন চালু করা হয়। মূল রেল নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন এই পুরো রুটে ১০টি সক্রিয় স্টেশনকে ঘিরে জমজমাট থাকত স্থানীয় অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রা।
তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে ১৯৯৮ সালে ঐতিহ্যবাহী রেললাইনটি চিরতরে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর শুরু হয় এর ধ্বংসযজ্ঞ; ২০১২ সালে রেলপথের অবশিষ্ট মহামূল্যবান মালামাল নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়। রেললাইন তুলে নেওয়ার পর অরক্ষিত ও অব্যবহৃত সরকারি জমির বিশাল অংশ ধীরে ধীরে অবৈধ দখলে চলে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ দখলদারদের থাবায় আজ মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে এই রেলরুট।
দীর্ঘ আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় বাগেরহাটের সাধারণ মানুষের মাঝে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বঞ্চনাবোধ বিরাজ করছে। তাঁদের মতে, বর্তমান সময়ে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটলেও বাগেরহাটের এই অবহেলিত জনপদটি রেল সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। অথচ এই রুটটি পুনরায় সচল করা হলে জেলার কৃষিপণ্য ও ব্যবসায়িক মালামাল পরিবহন খরচ বহুলাংশে কমে আসত এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত হতো আরও সহজ ও সাশ্রয়ী। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই কেবল প্রবীণদের মুখে শোনা গল্পের ওপর ভরসা করে বেঁচে আছে, বাস্তবে ট্রেন দেখার সৌভাগ্য তাদের হয়নি।
এ বিষয়ে বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ বলেন, “আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অবহিত করেছি। আমি আন্তরিকভাবে চাই, সরকার অতি দ্রুত এই জনগুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী রেলপথটি পুনরায় চালুর কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করুক।”
খুলনা গেজেট/এনএম
