ইসরায়েলে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে নতুন পার্লামেন্ট নির্বাচন। আর সপ্তাহ খানেক পর যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেবেন মার্কিনরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই নির্বাচনের ফলাফল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ সরকার মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধগুলোর গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন এলে যুদ্ধ পরিচালনা থেকে শুরু করে বিশ্ব অর্থনীতি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়তে পারে।
দুই নির্বাচনের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্রও রয়েছে। রিপাবলিকানস ওভারসিজ ইসরায়েলের চেয়ারম্যান মার্ক জেলের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ লাখ ইসরায়েলির কাছে মার্কিন পাসপোর্ট রয়েছে। ফলে তারা দুটি নির্বাচনেই ভোট দিতে পারবেন। জেল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে এসব ভোটার প্রভাব ফেলতে পারেন। এর মধ্যে মিশিগানের সিনেট নির্বাচনও রয়েছে। তার অনুমান, ইসরায়েল থেকে সেখানে প্রায় ১০ হাজার অনুপস্থিত ভোটারের ব্যালট জমা পড়বে।
ইরান যুদ্ধ ঘিরে নির্বাচনী হিসাব
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে চলমান ইরান যুদ্ধ শুরু হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দুই নির্বাচনেরই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ব্যাপক বিমান হামলায় ইরানের অনেক সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয় এবং দেশটির নেতৃত্বের বড় একটি অংশ নিহত হয়। তবে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্য পূরণ হয়নি। পাল্টা আঘাতের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি ও এর মধ্য দিয়ে চলাচলকারী জ্বালানির সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে নেয় তেহরান।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নির্বাচনী প্রচারে ইরানে নতুন করে হামলার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। কোনো প্রমাণ না দিয়েই ইরানের পারমাণবিক হুমকি নিয়ে নতুন দাবি করেছেন এবং দেশটির ইসলামি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে প্রাণঘাতী হামলার পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর ভাবমূর্তি বড় ধাক্কা খেয়েছিল। নির্বাচনী প্রচারে ইরান প্রসঙ্গ তুলে তিনি সেই ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পও নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচনী প্রচারে সমর্থন দিয়ে বলেছেন, ইরানে দুই নেতারই ‘শিগগির কাজ শেষ করা’ উচিত। তবে নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম আরো বেড়ে গেলে মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষ বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে হামলা থেকে বিরত রেখেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যমে আলোচনা চলছে, নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা থাকলে নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইরানে ফের হামলার উদ্যোগ নিতে পারেন নেতানিয়াহু। এর মাধ্যমে বিরোধী দলগুলোর জোটের পরিবর্তে তার অংশগ্রহণে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের দাবি তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বিরোধী নেতা ও সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকট এরই মধ্যে এমন সরকারে যোগ না দেয়ার কথা জানিয়েছেন। ইরানকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করলেও রাজনৈতিক স্বার্থে যুদ্ধ বাড়ানোর বিরোধিতা করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্পও ইরানে নতুন হামলার বিষয়ে আরো বেশি স্বাধীন ভাবতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। তাদের ধারণা, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় দুর্বল হয়ে পড়া ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা চালালে দেশটির জনগণ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে। তবে অতীতেও এ ধরনের কৌশল ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে।
একজন পশ্চিমা কূটনীতিকের ভাষ্য, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে পারেন। ইসরায়েলে নতুন সরকার এলে ইরানে হামলার বিষয়ে দেশটির অবস্থানও বদলাতে পারে। নেতানিয়াহু ছাড়া অন্য কেউ প্রধানমন্ত্রী হলে যুক্তরাষ্ট্রকে একাই ইরান মোকাবেলার কাজ করতে হবে বলে ট্রাম্প সতর্ক করেছেন।
বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে যুদ্ধের প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নির্বাচন ঘিরে বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় ও নিত্যপণ্যের দাম বড় ইস্যু। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বাধা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। ভোটারদের অসন্তোষ কমাতে ট্রাম্প রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছেন। মস্কো থেকে ডিজেল আমদানির মাধ্যমে জ্বালানির দাম কমানোর আশা করেছিলেন তিনি। ইউক্রেনের নেতৃত্বকেও ছাড় দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে পররাষ্ট্রনীতিতে সাফল্য দাবি করতে পারেন। তবে এসব উদ্যোগে এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত ফল মেলেনি।
ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি নিয়ে রিপাবলিকানদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে। নর্থ ক্যারোলিনার সিনেটর থম টিলিস বলেছেন, জ্বালানির দাম কমাতে চাইলে ট্রাম্পের উচিত ইরান সমস্যার সমাধান করা, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সুবিধা দেয়া নয়।
ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলকে সমর্থনের দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় ঐকমত্যেও ফাটল ধরিয়েছে। মিশিগানে ডেমোক্র্যাটদের বামপন্থী সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা কমানোর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। তার বক্তব্য, যে মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ নিয়ে দেশটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধে জড়ায়, তাকে প্রকৃত মিত্র বলা যায় না। নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস প্রার্থী ব্র্যাড ল্যান্ডার নির্বাচনের কয়েক দিন আগে পশ্চিম তীরে গিয়ে ফিলিস্তিনিদের জলপাই সংগ্রহে সহায়তা করেন। এসময় ইসরায়েলি বাহিনী তাকে অল্প সময়ের জন্য আটক করে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এ ধরনের ঘটনা আগে স্বাভাবিক ছিল না।
এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলেও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহায়তার ওপর নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে ট্রাম্পের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্কেরও অবসান ঘটবে। দুই নেতার সম্পর্ক আগেও কখনো ঘনিষ্ঠ, কখনো টানাপড়েনপূর্ণ ছিল। নতুন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে মেয়াদ শেষের পথে থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে বেশি নিয়ন্ত্রণ পেলে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা এবং যুদ্ধের ব্যয় সীমিত করার উদ্যোগ নিতে পারে। সামরিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেসের ক্ষমতা রয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা ও ভেটো দেয়ার অধিকার থাকবে। ফলে কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলালেও যুদ্ধের বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হবে না।
ইরানে নতুন করে হামলা হলে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো, পাইপলাইন, সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল এবং পানি লবণমুক্ত করার স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে বলে ইরানি কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এমন পাল্টা হামলা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
চলতি বছরের শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা আগামী দিনগুলোতে যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তা শুধু দুই দেশের সরকারই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং বিশ্ব অর্থনীতির পরবর্তী গতিপথও নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।
বিবিসির সংবাদ ভাষ্য থেকে সংক্ষেপিত
