জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটলেও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কার্যক্রমে স্বৈরাচারী মানসিকতা ও দলীয় প্রীতির ভূত এখনো কাটেনি।
নৌকাপ্রীতি ছাড়তে পারছে না এনসিটিবি
জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটলেও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কার্যক্রমে স্বৈরাচারী মানসিকতা ও দলীয় প্রীতির ভূত এখনো কাটেনি। সম্প্রতি ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাথমিক স্তরের মুদ্রিত বইগুলোতে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয়ভাবে শত শত ‘নৌকা’র ছবি যুক্ত থাকার চাঞ্চল্যকর তথ্য নিয়ে দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা সহ অন্যান্য গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই দেশজুড়ে সচেতন অভিভাবক, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। সংবাদ প্রকাশের পরও এনসিটিবির এই রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক অবস্থান থেকে সরে না আসার ঘটনায় শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের শিক্ষাবিদ ও সাধারণ অভিভাবকগণ।
বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা, ইংরেজি এবং গণিত বইগুলোতে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ৩০ থেকে ৪০টি পর্যন্ত নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি ইংরেজি বর্ণমালা শেখানোর সময়ও বর্ণ ও শব্দের মিল না রেখে অপ্রাসঙ্গিকভাবে নৌকার ছবি বসানো হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর শিক্ষা ব্যবস্থাকে দলীয়করণ ও ফ্যাসিবাদী প্রতীকমুক্ত করার জোরালো দাবি উঠলেও এনসিটিবির ভেতরের ঘাপটি মেরে থাকা সিন্ডিকেট নানা কৌশলে আগের সেই রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা টিকিয়ে রাখার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অনভিপ্রেত ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা এবং ইউনির্ভসিটি টিচার্স লিংক এই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, কোমলমতি শিশুদের পাঠ্যবইকে কোনো দলের প্রতীক প্রচারের মাধ্যম বানানোর অধিকার কারও নেই। এনসিটিবির ভেতরের আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতা ও পুরনো সুবিধাভোগীদের বহাল তবিয়তে রাখার পরিণামই আজকের এই পাঠ্যপুস্তক সংকট।
ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা বলেন, “যে ছাত্র-জনতার রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বর্তমান বিএনপির সরকার এবং নতুন বাংলাদেশ গঠিত হয়েছে, সেই রক্তের সাথে প্রতারণা করছে এনসিটিবির কিছু কুচক্রী কর্মকর্তা। পাঠ্যপুস্তকের প্রতিটি পাতায় ফ্যাসিবাদের প্রতীক ও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা লুকিয়ে রেখে তারা মূলত নতুন প্রজন্মকে অন্ধ রাখতে চায়। অবিলম্বে এনসিটিবির শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটকে অপসারণ করে পাঠ্যবই সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন করতে হবে।” জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সম্মুখসারিতে লড়াই করা তরুণ ছাত্রনেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “আমরা ফ্যাসিবাদকে রক্ত দিয়ে বিদায় করেছি পাঠ্যবইয়ে নৌকা বা অন্য কোনো দলের প্রতীক দেখার জন্য নয়। এনসিটিবি যদি নিজেদের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসরদের রক্ষা করতে চায়, তবে ছাত্রসমাজ রাজপথে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।” রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলের প্রাথমিক শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, শিশুরা বর্ণমালা শিখবে নাকি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতীক চিনবে? পাঠ্যবইয়ে এভাবে দেদারছে নৌকার ছবি ছাপানো পরিষ্কারভাবে রাজনৈতিক হীনম্মুন্যতা ও ফ্যাসিবাদের অবশিষ্টাংশ ধরে রাখার অসুস্থ মানসিকতা। অবিলম্বে এই বিতর্কিত ও অপ্রাসঙ্গিক ছবিগুলো বই থেকে অপসারণ করার জন্য সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন নাগরিক সমাজ ও অভিভাবকরা। অন্যথায় জুলাইয়ের চেতনাবিরোধী এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে বৃহত্তর ছাত্র-জনতার আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
বইয়ের সম্পাদকরা ধরাছোঁয়ার বাইরে
পাঠ্যবইয়ে দাঁড়িপাল্লা ও নৌকার অপ্রয়োজনীয় ছবি রাখাকে কেন্দ্র করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ৯ জন কর্মকর্তাকে একযোগে বদলি করা হয়েছে। গতকাল সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাদের বদলি করা হয়। এর আগে গত রোববার আরেক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। দুই দিনে ১০ কর্মকর্তার এ গণবদলি ঘিরে নানান প্রশ্ন উঠেছে। এনসিটিবি সূত্র বলছে, যাদের এ কাজের সঙ্গে ন্যূনতম সম্পৃক্ততা নেই, এমন কর্মকর্তাদেরও বদলি করা হয়েছে। পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, দাঁড়িপাল্লা ও নৌকার ছবি রাখা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সৃষ্ট অস্থিরতার সুযোগে কয়েকজন কর্মকর্তার উসকানিতে গণবদলি করা হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগের আমলে সুবিধাভোগী ও বিতর্কিত কর্মকর্তা এনসিটিবি সচিবের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লা রাখার ঘটনায় গবেষণা কর্মকর্তা মু. আব্দুল্লাহ আল যোবায়েরকে রোববার বদলি করে খাগড়াছড়িতে পাঠানো হয়। তিনি বিএনপিপন্থি কর্মকর্তা বলে জানাযায়। ফলে বিষয়টি নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। তবে গতকাল সোমবার যে ৯ জন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে, তার মধ্যে অনেকের এ ঘটনায় সম্পৃক্ততা নেই। তাদের সম্পাদিত বইয়েও কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়ে নি। তাদের মধ্যে অন্যতম এম এম আসাদুজ্জামান। তিনি অষ্টম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইটির দায়িত্বে ছিলেন। এবার বইটিতে ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবসসহ নতুন বিভিন্ন তথ্য যুক্ত করা হয়েছে। তাতে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি পাওয়া যায় নি। পাশাপাশি আসাদুজ্জামান বিএনপিপন্থি কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। ছাত্রজীবনে তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন।
২০০৬ সালের কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন কমিটির দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। অথচ ষষ্ঠ শ্রেণির বইয়ে দাঁড়িপাল্লা ও প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণির বইয়ে নৌকা রাখার ঘটনায় তাকে লালমনিরহাট সরকারি কলেজে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে বদলি করা হয়েছে। বিএনপি সরকারের আমলে ছাত্রদলের সাবেক নেতা আসাদুজ্জামানের বদলি ঘিরে খোদ এনসিটিবির কর্মকর্তারা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বই সম্পাদনার কাজ করেছেন গবেষণা কর্মকর্তা মাহমুদ বিন আমিন। তাকেও বদলি করা হয়েছে। অথচ তার বইয়েও কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতির অভিযোগ নেই। মাহমুদকে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে সমাজকল্যাণ/সমাজকর্ম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে বদলি করা হয়েছে।
গণবদলির শিকার বাকি ৭ জন কর্মকর্তা আওয়ামীপন্থি হিসেবে পরিচিত। তাদের অনেকে বিগত আওয়ামী লীগ আমলে এনসিটিবিতে পদায়ন পান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তারা বিভিন্ন তদবির করে এনসিটিবিতে টিকে যান। আওয়ামীপন্থি হিসেবে বদলি করা ৭ কর্মকর্তা হলেন- এনসিটিবির বিশেষজ্ঞ ও পদার্থবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল হক ভূঞা; গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর; শিক্ষা বিশেষজ্ঞ মো. আহসানুল আরেফিন চৌধুরী। গবেষণা কর্মকর্তা ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আবু হানিফ; সম্পাদক অধ্যাপক রেজাউল করিম; গবেষণা কর্মকর্তা ও সহকারী অধ্যাপক মনির হোসেন মজুমদার; বিশেষজ্ঞ ও ইংরেজির সহযোগী অধ্যাপক আফসানা আইয়ুব।
আওয়ামীপন্থি ট্যাগিং দিয়ে বদলি করা দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পাঠ্যবইয়ে নৌকার ছবি বিগত বছরগুলোতেও ছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৫ ও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে এ ছবিগুলো থাকলেও কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। হঠাৎ এখন দাঁড়িপাল্লার ছবি রাখা ঘিরে বিতর্কের মধ্যে নৌকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। যদি কর্তৃপক্ষ এটা আমাদের নোট দিতো, তাহলে আমরা পরিবর্তন করতাম। কিন্তু কোনো নোট দেওয়া হয় নি, নির্দেশ পাওয়া যায় নি, অথচ এখন দোষারোপ করে বদলি করা হচ্ছে।
এদিকে, পাঠ্যবইয়ে নৌকার ছবি রাখার ঘটনায় আওয়ামীপন্থি হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের গণহারে বদলি করা হলেও অনেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এনসিটিবি সূত্র জানায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক স্তরের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে অপ্রয়োজনে অনেক জায়গায় নৌকার ছবি ব্যবহার নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। অথচ প্রাথমিক স্তরের প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ের ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. আব্দুল মুমিন মোছাব্বির এবং চতুর্থ-পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ের কাজ করা গবেষণা কর্মকর্তা মো. রাকিবুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, ‘বদলির বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেখে। এখানে আমার কোনো হাত নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বদলি ও পদায়নের পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে। কী কারণে এবং কেন তাদের বদলি করা হয়েছে, সেটিও আমি জানি না।’
