রংপুরের বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলার তিনটি সার ডিলার পয়েন্টে সার বিক্রি ও বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও বিক্রয় মেমো ও রেজিস্টারের হিসাবে অসংগতি, কোথাও খুচরা বিক্রেতার কাছে সার সরবরাহ, আবার কোথাও বিক্রয়কেন্দ্র নিয়মিত খোলা না রাখার তথ্য পাওয়া গেছে। সরেজমিনে নথিপত্র যাচাই ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। বদরগঞ্জের একটি ডিলার পয়েন্টে এক দিনের ইউরিয়া বিক্রির হিসাবে ৩৪ বস্তার পার্থক্য পাওয়া গেছে।
বদরগঞ্জ উপজেলার ১৫ নম্বর লোহানী ইউনিয়নের মণ্ডলের হাটে মেসার্স শান্তি সার বিতানের ১৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের বিক্রয় মেমোতে ৩১ বস্তা ইউরিয়া বিক্রির তথ্য রয়েছে। অথচ একই দিনের সেল রেজিস্টার ও স্টক রেজিস্টারে বিক্রি দেখানো হয়েছে ৬৫ বস্তা। এতে ৩৪ বস্তা ইউরিয়ার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া ছয় বস্তা ইউরিয়া সরবরাহের একটি মেমোতে থাকা মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করলে সুজন নামের এক ব্যক্তি জানান, তাঁর ‘সুজন ট্রেডার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তিনি কীটনাশকের পাশাপাশি সার বিক্রি করেন এবং ওই ডিলারসহ অন্য ডিলারদের কাছ থেকেও সার সংগ্রহ করেন। অন্য একটি মেমোতে থাকা নম্বরে যোগাযোগ করলে মেরাজ নামের এক ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি কোনো সার নেননি। তাঁর নাম ব্যবহার করে কে সার নিয়েছেন, তা-ও তিনি জানেন না।
মেসার্স শান্তি সার বিতানের ব্যবস্থাপক সন্দীপ বাবু বলেন, হিসাবের পার্থক্যে থাকা ৩৪ বস্তা ইউরিয়া মেমো ছাড়াই বিক্রি করা হয়েছে। কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ও নির্দেশনায় খুচরা বিক্রেতাদের সার দেওয়া হয় বলেও তিনি দাবি করেন। তবে হিসাবের অসংগতির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ডিলার মালিক সুবোধ কুমার কুন্ডু (গোবিন্দ) অভিযোগের স্পষ্ট জবাব না দিয়ে ঘটনাটিকে ভুলবশত হয়েছে বলে বিবেচনা করে বিষয়টি না বাড়ানোর অনুরোধ জানান।
বদরগঞ্জের শ্যামপুর ইউনিয়নের বিএডিসি সার ডিলার মেসার্স শ্যামপুর সার ঘর, যার প্রোপ্রাইটর হাবিবা বেগম, সেই প্রতিষ্ঠান থেকেও সম্প্রতি ১০ বস্তা ইউরিয়াসহ একটি ভ্যান আটক করা হয়। অভিযোগ, সারগুলো কৃষকের পরিবর্তে খুচরা বিক্রেতার কাছে পাঠানো হচ্ছিল। ডিলারের ব্যবস্থাপক রেজাউল ফোনে দাবি করেন, সার কৃষকের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে মেমোতে থাকা নম্বরে যোগাযোগ ও ভ্যানচালকের বক্তব্যে সার খুচরা দোকানে পাঠানোর তথ্য পাওয়া যায়।
ডিলার পয়েন্টে মেমো ও রেজিস্টার যাচাই করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিক্রির পরিমাণে অসংগতি দেখা যায়। ব্যবস্থাপক রেজাউল এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে দাবি করেন, কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তার যোগসাজশে এমনটি করা হয়। তবে তাঁর এ অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বদরগঞ্জের লোহানী ইউনিয়নের কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা জিয়া বলেন, খুচরা বিক্রেতার কাছে সার বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং মেমো ছাড়া এক কেজি সার বিক্রিরও নিয়ম নেই। অনিয়ম হয়ে থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শ্যামপুরের কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নীতিমালাবহির্ভূত সার বিক্রি বা অনিয়ম করার সুযোগ নেই। তবে অভিযোগের বিষয়ে তিনি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সেলিনা আফরোজ বলেন, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত চার সদস্যের তদন্ত দলের সঙ্গে আজ সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। এ সময় বদরগঞ্জের লোহানী ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার পয়েন্টে অনিয়মের সত্যতা পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এদিকে বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলার অধিকাংশ খুচরা সার বিক্রেতার দোকানে বিপুল পরিমাণ সার মজুত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব দোকানে মজুত থাকা সারের উৎস, ডিলারদের কাছ থেকে সরবরাহের পরিমাণ এবং বিক্রয়সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করা হলে কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার বিতরণের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।
অন্যদিকে, মিঠাপুকুর উপজেলার ছড়ান ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার কামরুজ্জামান ট্রেডার্সের বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক কামরুজ্জামান স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তিনি আত্মগোপনে থাকায় খলিল নামের এক ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন খোলা থাকে। সরেজমিনে পাঁচ দিন গিয়েও এটি বন্ধ পাওয়া যায়। ষষ্ঠ দিনেও বন্ধ থাকায় কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পর প্রতিষ্ঠানটি খোলা হয়। পরিদর্শনের সময় ব্যবস্থাপক সেল রেজিস্টার দেখাতে পারেননি। মেমো ও স্টক রেজিস্টারেও অসংগতি দেখা যায়। গুদামে সার রাখার জন্য মেঝের ওপর পাটাতনের কোনো ব্যবস্থাও ছিল না।
সাংবাদিকদের কাগজপত্র দেখার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনাকারী খলিলুর রহমান বলেন, “আপনাদের কাছে সঠিক তথ্য থাকলে নিউজ করেন, আমি দেখে নিবো আপনাদেরকে।” বক্তব্যটি সাংবাদিকদের প্রতি হুমকিসূচক বলে প্রতীয়মান হয়।
খলিলুর রহমান মিঠাপুকুর বণিক সমিতির সভাপতি এবং বিএডিসি সার অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত আছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
মিঠাপুকুরের কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা বলেন, তিনি সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ডিলার পয়েন্টে থাকেন। মেমো ও রেজিস্টারের অসংগতির জন্য তিনি ব্যবস্থাপককে দায়ী করেন।
মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান হেকিম বলেন, তিনি খলিলুর রহমানকে সাংবাদিকদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে বলেছেন। খুচরা বিক্রেতার কাছে তিন থেকে চার বস্তা সার দেওয়ার নিয়ম রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বা তারিখ উল্লেখ করতে পারেননি। মেমো ছাড়া সার বিক্রি এবং রেজিস্টারের হিসাব সংরক্ষণে অনিয়মের সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি। তবে এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্রের আলোকে অনুমোদিত খুচরা বিক্রেতা ও সার বিতরণের প্রযোজ্য নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি। তিনটি ডিলার পয়েন্টের নথিপত্রের অসংগতি, খুচরা বিক্রেতাদের দোকানে বিপুল পরিমাণ সার মজুত এবং সার সরবরাহের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার কোথায় যাচ্ছে, তা স্পষ্ট হতে পারে।
সরকারি ডিলারদের এমন কর্মকাণ্ডে সরকারের কৃষিবান্ধব উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এবং প্রান্তিক কৃষকেরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয় কৃষকদের।
