সরকারের পরিকল্পিত উদ্যোগ, বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ গবেষণা এবং দক্ষ নারী কারিগরদের শ্রমে হারানো ঐতিহ্য ঢাকাই মসলিন ফিরে এসেছে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে। একসময় বিশ্বজুড়ে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই সূক্ষ্ম বস্ত্র এখন গবেষণাগার ও প্রদর্শনীর গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্যিক উৎপাদনের পথে। আদি তুলার জাত পুনরুদ্ধার, সুতা তৈরির প্রাচীন প্রযুক্তির পুনঃপ্রবর্তন এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পকে উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন পরিচিতি দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
সরকারের এই উদ্যোগের ফলে শুধু ঐতিহ্যবাহী একটি শিল্পের পুনর্জাগরণ ঘটছে না, গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান, কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ এবং রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো সফলভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব ঐতিহ্যনির্ভর বিলাসবহুল পণ্যও বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিতে পারবে।
ঢাকাই মসলিনের পুনরুজ্জীবনে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উদ্যোগে গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়। এর প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল মসলিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অতি সূক্ষ্ম সুতা উৎপাদনে সক্ষম ঐতিহাসিক ‘ফুটি কার্পাস’ তুলার জাত শনাক্ত করা এবং হারিয়ে যাওয়া বুননপ্রযুক্তি পুনরুদ্ধার করা।
গবেষকরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বন্য তুলার নমুনা সংগ্রহ করেন। ঐতিহাসিক নথি, পুরোনো নমুনা ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সহায়তায় আদি তুলার জাত শনাক্ত এবং তা চাষের উপযোগী করার চেষ্টা চালানো হয়। পাশাপাশি মসলিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ যন্ত্রপাতি ও প্রাচীন সুতা কাটার পদ্ধতিও পুনরায় প্রস্তুত করা হয়।
এই দীর্ঘ গবেষণার ফলে ঢাকাই মসলিন তৈরির উপযোগী তুলা উৎপাদন ও সূক্ষ্ম সুতা কাটার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আসে। সাধারণ সুতির কাপড়ের তুলনায় অনেক বেশি সূক্ষ্ম সুতা ব্যবহারের কারণে মসলিনের স্বচ্ছতা, কোমলতা ও হালকা বুনন এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে ফিরে এসেছে।
প্রাথমিক গবেষণার সাফল্যের ধারাবাহিকতায় সরকার মসলিন পুনরুজ্জীবনের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এই পর্যায়ে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবোতে প্রতিষ্ঠিত ‘ঢাকাই মসলিন হাউস’ এ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখান থেকে মসলিন তৈরির প্রযুক্তি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে সরকারি গবেষণায় অর্জিত জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে।
প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদনের পরিসর সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। এতে মসলিন তৈরির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের সক্ষমতাও বাড়তে পারে।
মসলিন পুনরুজ্জীবন প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রান্তিক নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি। অতি সূক্ষ্ম সুতা কাটার জন্য তিন শতাধিক নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
মসলিনের সুতা তৈরি অত্যন্ত ধৈর্য, নিপুণতা ও বিশেষ দক্ষতানির্ভর কাজ। ফলে এই শিল্পে প্রশিক্ষিত নারীদের অংশগ্রহণ শুধু উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নয়, ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের জ্ঞান সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ যুক্ত হলে গ্রামীণ পর্যায়ে আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে তুলা চাষ, সুতা উৎপাদন, বয়ন ও বিপণনকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
মসলিনের বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্প্রসারণে নিরবচ্ছিন্ন কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। এ লক্ষ্য সামনে রেখে কাপাসিয়া, রাজশাহী ও কুমিল্লার গ্রামীণ কৃষকদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক তুলা চাষের ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ফুটি কার্পাসের জাত আরও উন্নত করার বিষয়েও কাজ চলছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মসলিন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় তুলার সরবরাহ বাড়বে এবং কৃষকদের জন্য বিশেষায়িত ফসল উৎপাদনের নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। তবে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে তুলার গুণগত মান, চাষের উপযোগী পরিবেশ এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ঢাকাই মসলিনের ঐতিহাসিক পরিচিতি ও অনন্য বুননশৈলী আন্তর্জাতিক বিলাসবহুল ফ্যাশন বাজারে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জাপানের মতো দেশের বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোর আগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মসলিনের কাপড় সরবরাহের অর্ডার পাওয়ার তথ্য এই সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকাই মসলিন বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই স্বীকৃতি পণ্যটির স্বতন্ত্র ভৌগোলিক পরিচিতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে মসলিনের বাণিজ্যিক সাফল্য নির্ভর করবে মান বজায় রেখে উৎপাদন বাড়ানো, আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বিপণন এবং পণ্যের স্বকীয়তা সুরক্ষার ওপর। একটি মসলিন শাড়ি তৈরি করতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে উৎপাদন খরচও বেশি। সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে একটি শাড়ি তৈরির খরচ প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা; উৎপাদন সম্প্রসারণের মাধ্যমে তা ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
একসময় ঢাকাই মসলিন ছিল বাংলার বুননশিল্পের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। অত্যন্ত সূক্ষ্ম সুতা, স্বচ্ছ বুনন এবং কারিগরদের অসাধারণ দক্ষতার কারণে এই কাপড় বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছিল। ঔপনিবেশিক আমলে নানা প্রতিকূলতা ও উৎপাদনব্যবস্থার অবক্ষয়ে শিল্পটি হারিয়ে যায়।
দীর্ঘ বিরতির পর সরকারি উদ্যোগে মসলিনের পুনরুজ্জীবন বাংলাদেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। গবেষণা, কৃষি, কারুশিল্প, নারী কর্মসংস্থান এবং রপ্তানিকে একই ধারায় যুক্ত করতে পারলে এই উদ্যোগ দেশের বস্ত্র খাতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
ঢাকাই মসলিনের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ঐতিহ্যের স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখে উৎপাদন বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরি করা। সরকারি পরিকল্পনা, বেসরকারি বিনিয়োগ ও দক্ষ কারিগরদের সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে একসময় বিশ্বজোড়া খ্যাতি পাওয়া এই বস্ত্র বাংলাদেশের উচ্চমূল্যের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিতে পারে।
