নিরাপদ কর্মস্থল ও বাসস্থান মানুষের অধিকার। একজন নাগরিক সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদে কর্মস্থলে যাবে, আবার সন্ধ্যায় নিরাপদে ঘরে ফিরে আসবে; তার সন্তান বা পরিবারের মানুষগুলোও ঠিক একইভাবে যেন নিরাপদে কর্মস্থলে গিয়ে আবার নিরাপদে ফিরে আসতে পারে-এই মৌলিক চাওয়াগুলিই সব শ্রেণিপেশার মানুষের। তিনবেলা পেট পুরে খেতে পারলে, শান্তিতে ঘুমাতে পারলে, আর পরিবারের মানুষগুলি নিয়ে একটা নিশ্চিন্ত জীবন কোনোমতে পার করতে পারলেই এ দেশের অধিকাংশ মানুষ খুশি। আর এটাইতো মানুষের নাগরিক জীবনের ন্যূনতম প্রত্যাশা।
দেশের মানুষ এখন বড় বড় প্রতিশ্রুতির চেয়ে ছোট কিন্তু মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান আগে দেখতে চায়। কারণ রাষ্ট্রের সাফল্য সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় তার প্রতিদিনের কার্যক্রমে। আজ একজন সাধারণ মানুষ যখন দরজা খুলে রাস্তায় বের হন, তার প্রথম প্রশ্ন থাকে আমি নিরাপদে ফিরতে পারব তো? বাজারে গেলে দ্বিতীয় প্রশ্ন আজ সংসারের বাজার কত টাকা লাগবে? বাসায় ফিরলে আরেক প্রশ্ন গ্যাস আছে তো? বিদ্যুৎ থাকবে তো? আর ব্যবসা করলে প্রশ্ন চাঁদা দিতে হবে না তো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ইতিবাচক হওয়াই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম অগ্রাধিকার। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই নির্বিঘ্নে পূজা সম্পন্ন করা সরকারের একটি বড় সাফল্য।
যদিও ইতোপূর্বে বেশ কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনাসহ সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের যে উদ্বেগ তা কোনোভাবেই শেষ হচ্ছে না বরং নিত্য নতুন ঘটনা নতুন রুপে আবির্ভূত হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামের এমপি নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রীর মর্মান্তিক আত্মহত্যা, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নাহিদা বেগমের একমাত্র ১৩ বছরের ছেলে অপ্রতিমকে নৃশংসভাবে হত্যা, আগস্টের শেষ দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের কাছে ছিনতাইয়ের ঘটনায় বগুড়ার স্কুলশিক্ষকের মর্মান্তিক মৃত্যু সারাদেশের মানুষকে নাড়া দিয়েছিল।
মানুষ যেন স্বস্তি পাচ্ছে না কোন কিছুতেই! একের পর এক এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি অপরাধের ঘটনা নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তাবোধে আঘাত। রাজধানীতে সংগঠিত ছিনতাই ও ডাকাতির বিভিন্ন চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে ডিএমপির বিশেষ অভিযানে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের খবরও এসেছে। কিন্তু এতে কি কোনো স্বস্তি আসছে? অপরাধ দমনে আরো কঠোর অভিযান প্রয়োজন। কিন্তু আবার শুধু অভিযান দিয়েও স্থায়ী সমাধান হবে না।
প্রয়োজন অপরাধের উৎস, নেটওয়ার্ক, অর্থায়ন, অস্ত্র, মাদক, চোরাই পণ্য এবং অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতার পথ বন্ধ করা। সাধারণ মানুষ প্রতিদিন এসবে এখন অনেক ক্ষুব্ধ ও অতিষ্ঠ হচ্ছে। মানুষ এখন আর কোনো গল্প শুনতে চায়না, যেভাবেই হোক জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখতে চায়। আর এজন্য সরকারি দলের লোকেরা অন্যায় করলে তাকেও কঠিন শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আর অতীত থেকে শিক্ষা না নিতে পারলে সামনে আরও ভয়াবহ দিনের অপেক্ষায় থাকতে হবে। নাগরিকের প্রশ্ন খুব সরল একজন মানুষ যদি মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে ভয় পান, রাতে বাসায় ফিরতে ভয় পান, কিংবা রিকশায় বসে ব্যাগ আঁকড়ে ধরেন, তাহলে উন্নয়নের সুফল তিনি কীভাবে অনুভব করবেন?
দ্রব্যমূল্য দাম নিয়ন্ত্রণ এখন সরকারের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর আরেকটি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ আগস্টের হিসাবে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮.২৬ শতাংশে নেমেছে, যা জুলাইয়ের ৮.৩২ শতাংশের চেয়ে সামান্য কম। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৭.০২ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু একই সময়ে খাদ্যপণ্যের মাসিক মূল্যসূচক ৩.৮৬ শতাংশ বেড়েছে।
অর্থাৎ বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও বাজারদর কমে গেছে এমনটি বলা যায় না। এখানেই সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা আর পরিসংখ্যানের মধ্যে পার্থক্যটি বুঝতে হবে। মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশে নামা মানে বাজারের দাম ৭ শতাংশ কমে যাওয়া নয়; বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। ফলে যে পরিবার ইতোমধ্যে উচ্চমূল্যের সঙ্গে লড়ছে, তার জন্য স্বস্তি তখনই আসবে যখন পণ্যের প্রকৃত দাম আয় ও ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পর্যায়ে আসবে। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু মাঝে মাঝে অভিযান চালানো নয়। প্রয়োজন কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা।
কোথায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কোথায় পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, কোথায় মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা বাড়ছে, কোথায় মজুতদারি হচ্ছে এসব তথ্যভিত্তিকভাবে চিহ্নিত করতে হবে। বাজারে দৃশ্যমান উপস্থিতির চেয়ে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী সংস্কার বেশি জরুরি।
গত মাসে সরকারের প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের মূল্য লিটার প্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি ছিল একটি অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত। পর্যাপ্ত গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই তাহলে অর্থনীতি চলবে কীভাবে? গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব এখন শিল্প, কৃষি, পরিবহন, ব্যবসা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির উপর। গত সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও এলএনজি সরবরাহের সমস্যাও বাংলাদেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানি করা এলএনজির ওপর দেশের উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে। ফলে গ্যাসের সংকট মানে কারখানায় উৎপাদন কমা। আর উৎপাদন কমা মানে হল সরবরাহ কমা। সরবরাহ কমা মানে দাম বাড়ার চাপ। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচের একটি অংশ গিয়ে পড়ে ভোক্তার কাঁধে।
অর্থাৎ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং দ্রব্যমূল্য দুটি আলাদা সমস্যা নয়; তারা একই অর্থনৈতিক চক্রের অংশ। তাই দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি সরবরাহের বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদে নাগরিক ও শিল্প খাতে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারকে মনে রাখতে হবে চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে বাজারও নিয়ন্ত্রণে আসবে না। চাঁদাবাজিকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি অর্থনীতিরও সমস্যা। একজন ব্যবসায়ী যদি পণ্য পরিবহন, দোকান, বাজার, নির্মাণকাজ বা ব্যবসার বিভিন্ন পর্যায়ে অবৈধ অর্থ দিতে বাধ্য হন, তাহলে সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত ব্যবসার ব্যয়ের অংশ হয়ে যায়। আর ব্যবসার ব্যয় বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়।
তাই চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স শুধু অপরাধ দমনের ভাষা নয় এটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অর্থনৈতিক নীতিরও অংশ। কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক বা প্রশাসনিক পরিচয় যেন অপরাধের ঢাল না হয় এটি নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী হিসেবে ঘোষণা নয়; বরং নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণ, আইনি প্রক্রিয়া এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
রাস্তায় শৃঙ্খলা ফিরানোও জরুরি হয়ে পড়েছে। যান্ত্রিক রিকশাগুলোকে সিস্টেমের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আর বাংলাদেশের মানুষের প্রতিদিনের সবচেয়ে বড় অপচয়ের একটি হলো সময়। যানজট, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং বেপরোয়া গাড়ি চালানো সব মিলিয়ে সড়কব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই নাগরিক জীবনের জন্য দুর্ভোগের কারণ।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ নিজেই বলছে, তাদের সড়ক দুর্ঘটনার ডাটাবেজ পুলিশ-রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় এবং সব দুর্ঘটনা রিপোর্ট না হওয়ায় এই তথ্য পূর্ণাঙ্গ নয়। অর্থাৎ দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানের পাশাপাশি আমাদের দেখতে হবে কেন দুর্ঘটনা ঘটছে এবং কেন একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। শুধু ঈদ বা বিশেষ দিবসে যানজট নিরসনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিলে হবে না। সারা বছর এই শৃঙ্খলা কেন দৃশ্যমান হবে না? কারণ, মানুষের কাছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় স্বস্তি।
মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; নাগরিক কতটা নিরাপদে, নিশ্চিন্তে এবং মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারছেন সেখানেও তার শক্তির প্রকাশ ঘটে। মানুষ চায় না প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলার খবর শুনে আতঙ্কিত হতে। মানুষ চায় না বাজারে গিয়ে প্রতিদিন নতুন দামের সঙ্গে পরিচিত হতে। মানুষ চায় না গ্যাসের জন্য রান্নার সময় বদলাতে। মানুষ চায় না বিদ্যুতের অনিশ্চয়তায় ব্যবসা বা পড়াশোনা ব্যাহত হোক। মানুষ চায় না চাঁদাবাজির কারণে পণ্যের দাম বাড়ুক। মানুষ চায় না রাস্তায় বেরিয়ে জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে।
সব কিছুর মূলে মানুষ শান্তি চায়। আর এই শান্তি কোনো বিমূর্ত রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এর খুব বাস্তব অর্থ হচ্ছে-নিরাপদ রাস্তা, নিয়ন্ত্রিত বাজার, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, পর্যাপ্ত গ্যাস, চাঁদাবাজিমুক্ত ব্যবসা এবং সুশৃঙ্খল নগরজীবন। তাই সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় এসব বিষয়কে একেবারে সামনে আনতে হবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সাফল্য পরিমাপ করা যেতে পারে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কয়েকটি সহজ সূচকে অপরাধ কমেছে কি না, পণ্যের দাম স্থিতিশীল হয়েছে কি না, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ কতটা নির্ভরযোগ্য, চাঁদাবাজির অভিযোগ কতটা কমেছে এবং রাস্তায় মানুষের সময় কতটা বাঁচছে। উন্নয়ন মানুষের জন্য। অর্থনীতি মানুষের জন্য। রাষ্ট্র মানুষের জন্য। তাই মানুষের স্বস্তি যদি না বাড়ে, তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যানও মানুষের জীবনে তার পূর্ণ অর্থ বহন করবে না।
একথা ঠিক যে, সাধারণ মানুষ এখন পর্যন্ত‘ প্রধানমন্ত্রীর সাধারণ জীবন-যাপন ও চলাফেরাকে পছন্দ করছে। প্রধানমন্ত্রীর নানান উদ্যোগ ও কর্মকাণ্ডকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে না পারলে মানুষের খুব সাধারণ ও মৌলিক দাবিগুলো কিন্তু একসময়ে গিয়ে বড় দাবিতে পরিণত হবে এবং তা জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাই সময় থাকতে মানুষের সাধারণ দাবিগুলোর প্রতি যত্নশীল হোন। কারণ, সাধারণেরা অনেক কিছু চায় না, শুধু শান্তিতে বাঁচতে চায়। এই শান্তি নিশ্চিত করাই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম অগ্রাধিকার।
লেখকঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক
