সর্বশেষ আপডেট:
স্পোর্টস ডেস্ক
বিশ্বের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি পাওয়ার মুহূর্তে হ্যারি কেইনের মনে পড়ল পুরোনো দিনের কথা। যে ক্লাবে বেড়ে উঠেছেন, ইউরোপের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সেই টটেনহ্যাম হটস্পারকে ভুলে যাননি ইংলিশ অধিনায়ক। বায়ার্ন মিউনিখের জার্সিতে ব্যালন ডি’অর জিতলেও এই সাফল্যের পেছনে টটেনহ্যামের অবদান মনে করিয়ে দিলেন কেইন।
লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানে কিলিয়ান এমবাপে ও লামিনে ইয়ামালকে পেছনে ফেলে সেরার পুরস্কার জিতেছেন কেইন। এর মধ্য দিয়ে ইংল্যান্ডের ২৫ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছেন ৩৩ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার। সর্বশেষ ২০০১ সালে ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন মাইকেল ওয়েন।
পুরস্কার হাতে নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন কেইন। দীর্ঘ পথচলায় যাঁরা পাশে ছিলেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর একপর্যায়ে উঠে আসে টটেনহ্যামের নাম। সাবেক ক্লাবটির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘আমি টটেনহ্যাম হটস্পারকেও ধন্যবাদ জানাতে চাই। টটেনহ্যাম না থাকলে আজ আমি যেখানে আছি, সেখানে পৌঁছাতে পারতাম না।’
শৈশব থেকে টটেনহ্যামের সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতিও তুলে ধরেন ইংলিশ তারকা, ‘১১ বছর বয়স থেকে সেখানে ছিলাম। ক্লাবটির কাছ থেকে পাওয়া দিকনির্দেশনা, কোচদের সহযোগিতা আমাকে নিজের স্বপ্নপূরণের সুযোগ করে দিয়েছে। একসঙ্গে কাটানো ভালো-মন্দ সব অভিজ্ঞতাই আমাকে আজকের এই জায়গায় নিয়ে এসেছে।’
টটেনহ্যামের সঙ্গে কেইনের সম্পর্কটা দীর্ঘদিনের। ক্লাবটির একাডেমি পেরিয়ে মূল দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন। একটা সময় হয়ে ওঠেন দলের প্রধান গোলদাতা, সবচেয়ে বড় তারকা। ২০২৩ সালে জিমি গ্রিভসের দীর্ঘদিনের রেকর্ড ভেঙে টটেনহ্যামের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হন। ক্লাবটির হয়ে ৪৩৫ ম্যাচে তার গোল ২৮০টি।
তবে ব্যক্তিগতভাবে এত কিছু অর্জনের পরও টটেনহ্যামের হয়ে বড় কোনো দলীয় শিরোপা জেতা হয়নি কেইনের। সেই আক্ষেপ নিয়েই ২০২৩ সালে যোগ দেন বায়ার্ন মিউনিখে। জার্মান ক্লাবটির হয়ে এবার সাফল্যের সর্বোচ্চ স্বীকৃতিটাই পেলেন তিনি।
গত মৌসুমে বায়ার্নের হয়ে ৫১ ম্যাচে ৬১ গোল করেন কেইন। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৬৫ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা ছিল ৭৩। জার্মান ক্লাবটিকে বুন্দেসলিগা ও জার্মান কাপ জেতানোর পাশাপাশি ইংল্যান্ডকে নিয়ে যান বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। অসাধারণ এই পারফরম্যান্সই তাকে এগিয়ে দিয়েছে ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে।
টটেনহ্যামের পাশাপাশি ক্লাবটির সমর্থকদের কথাও ভোলেননি কেইন। বায়ার্ন, ইংল্যান্ড ও স্পার্স সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা যে সমর্থন আমাকে দিয়ে এসেছেন, তার সবটুকুই আমি উপলব্ধি করি। আমিও একসময় একজন সমর্থক ছিলাম। তাই আপনাদের ভালোবাসার প্রতিদান দেওয়ার সুযোগ পাওয়া আমার জন্য অনেক বড় সম্মানের।’
বায়ার্নের সতীর্থদের অবদানের কথাও বিশেষভাবে তুলে ধরেন কেইন। বিশেষ করে অনুশীলন ও ম্যাচে সতীর্থরা যেভাবে তাকে প্রতিনিয়ত আরও ভালো করার জন্য তাগিদ দেন, সেটিকে নিজের সাফল্যের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখেন তিনি।
ইংলিশ স্ট্রাইকার বলেন, ‘তোমরা আমাকে যেভাবে এগিয়ে যেতে সাহায্য করো, যেভাবে আমরা একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করি, তোমাদের ছাড়া এই অর্জন সম্ভব হতো না।’
বায়ার্ন কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানির প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান কেইন। অসুস্থতার কারণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি বেলজিয়ান এই কোচ। তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করে কেইন বলেন, ‘ভিনি, তোমার সুস্থতা কামনা করছি। আশা করি, এই পুরস্কার তোমাকে কিছুটা হলেও শক্তি জোগাবে।’
কোম্পানির অধীনে কাজ করে শুধু ফুটবলার হিসেবেই নয়, মানুষ ও নেতা হিসেবেও নিজের উন্নতির কথা তুলে ধরেন কেইন। ইংল্যান্ড জাতীয় দলের সতীর্থদেরও ধন্যবাদ জানান তিনি। জাতীয় দলের সতীর্থদের উদ্দেশে কেইন বলেন, ‘তোমাদের অধিনায়কত্ব করা এবং নেতৃত্ব দেওয়া সত্যিই অনেক বড় সম্মানের। এই পুরস্কার আমাদের সবার।’
ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেলকেও ধন্যবাদ জানান কেইন। কোচের নেতৃত্ব ও দলের মান আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন তিনি। পাশাপাশি ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে যাদের অধীনে খেলেছেন, তাদের কথাও স্মরণ করেন। সেই তালিকায় ছিলেন ব্র্যাডলি অ্যালেন, ক্রিস রামসে, জন ম্যাকডারমট, রায়ান মেসন, মাউরিসিও পচেত্তিনো, জোসে মরিনহো ও আন্তোনিও কন্তের মতো কোচরা।
তবে কেইনের বক্তব্যের সবচেয়ে আবেগঘন অংশটি ছিল পরিবারকে নিয়ে। বিশেষ করে স্ত্রী কেটের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে তার অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘কেট, তুমি আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। ভালো-মন্দ সব সময়েই তুমি পাশে ছিলে। তুমি আমার সবচেয়ে বড় সমর্থন। মনে হয়, তুমি আমার চেয়েও বেশি এই পুরস্কারটা চেয়েছিলে।’
স্ত্রীর ত্যাগের কথা স্মরণ করে আরও বলেন, ‘আমার স্বপ্নপূরণের জন্য তুমি অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছ। তোমাকে ছাড়া এটা সম্ভব হতো না। এই সাফল্য শুধু আমার নয়, আমাদের দুজনের। আমরা একটা দল।’
বাবা-মায়ের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন কেইন। ছোটবেলায় অনুশীলনে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে প্রতিটি ম্যাচে পাশে থাকার স্মৃতি তুলে ধরেন। সন্তানদের উদ্দেশেও ভালোবাসা জানান ইংলিশ অধিনায়ক।
নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের উদ্দেশে কেইনের বার্তা, ‘যেসব ছেলে-মেয়ে নিজেদের স্বপ্নপূরণ করতে চায়, তাদের বলব, সবকিছুই সম্ভব। আমার পথচলা সহজ ছিল না। আমি সরাসরি সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছাইনি। অনেক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, নিজেকে প্রমাণের জন্য লড়তে হয়েছে। আশা করি, আমার পথচলা অন্যদের অনুপ্রাণিত করবে।’
এদিকে সাবেক তারকার এমন অর্জনে উচ্ছ্বসিত টটেনহ্যামও। নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেইনকে অভিনন্দন জানিয়ে ক্লাবটি লিখেছে, ‘ওয়ান অব আওয়ার ওন’ অর্থাৎ, ‘আমাদেরই একজন’।
