এম. এ. আজিজ রাসেল, সিবিএন;
কক্সবাজারের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রবারণা পূর্ণিমার ফানুসের আলোয় বর্ণিল হয়ে উঠেছে আকাশ। সাম্প্রদায়িক অন্ধকার দূর করার প্রত্যয় নিয়ে আকাশে উড়ানো হয়েছে শত শত রঙ-বেরঙের ফানুস। কক্সবাজারের রামু, টেকনাফ, উখিয়া ও চকরিয়াতেও ফানুস উড়ানো হয়।
গত রোববার থেকে তিন দিনব্যাপী এ উৎসব শুরু হয়েছে। উৎসবের দ্বিতীয় দিন সোমবার (২৬ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর থেকে কক্সবাজারে শত শত ফানুস উড়ানো হয়। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে কল্পজাহাজ ভাসা উৎসবের মধ্য দিয়ে এ উৎসব শেষ হবে।
সন্ধ্যায় কক্সবাজার শহরের প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপনের বিভিন্ন বিহার ও প্যান্ডেল পরিদর্শন করেছেন কক্সবাজারের সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম ও বিএনপির মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল।
কক্সবাজার কেন্দ্রীয় মহাসাংদোগ্রী বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে দেখা যায়, বিকেল থেকে রাখাইন সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ নতুন পোশাক ও উন্নতমানের খাবার নিয়ে বিহারে আসছেন। সেখানে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় সবাই প্রার্থনা করেন।
এবার শহরের অগ্গমেধা বৌদ্ধ বিহার, পিটাকেট, মোহাজের পাড়া বৌদ্ধ বিহার, জাদিরাং বিহার এবং রাখাইন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনগুলো নজরকাড়া প্রায় ৫০টি নান্দনিক প্যান্ডেল তৈরি করেছে। প্যান্ডেলগুলোর মূল আকর্ষণ ছিল বুদ্ধের মূর্তি। জমকালোভাবে সাজানো হয়েছে এসব প্যান্ডেল। বিহারগুলোও সেজেছে নবরূপে। বর্ণিল আলোকসজ্জায় আলোকিত করা হয়েছে পুরো এলাকা। প্রবারণা পূর্ণিমাকে ঘিরে বৌদ্ধ পল্লীর ঘরে ঘরে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
কেন্দ্রীয় মহাসাংদোগ্রী বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটির সদস্য ডা. মায়েনু বলেন, ‘প্রবারণার মূল প্রতিপাদ্য আত্মশুদ্ধি, শুভ, সত্য ও সুন্দরকে বরণ করে অসত্য ও অসুন্দরকে বর্জন করা। আমি কামনা করি, মানুষের অন্তর থেকে সব মলিনতা দূর হয়ে অহিংসা, সাম্য, মৈত্রী, প্রেম ও দয়া জাগ্রত হোক।’
কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি ও রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের সহকারী পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু জানান, ‘শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে রাজকুমার সিদ্ধার্থ (গৌতম বুদ্ধ) দুঃখমুক্তি লাভের আশায় রাজ্য, রাজত্ব, ভোগ-বিলাস, ধন-সম্পদ ও সংসার সবকিছু ত্যাগ করে অনোমা নদীর তীরে রাজআবরণ সারথি ছন্দককে বুঝিয়ে দিয়ে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেন। এ সময় ভাবলেন, “আমি এখন সন্ন্যাসী, রাজকীয় এ বাহারি চুল আমার কী প্রয়োজন।” তাই তরবারি দিয়ে নিজের চুলের গোছা নিজেই কেটে নিলেন। এরপর মনে মনে ভাবলেন, “যদি আমার মধ্যে বুদ্ধ হওয়ার মতো পারমী থাকে, তাহলে এই চুলের গুচ্ছ মাটিতে পড়বে না, আকাশেই স্থিত থাকবে।” এই সংকল্প করে চুলের গোছা উপরের দিকে নিক্ষেপ করলেন রাজকুমার। আশ্চর্যের বিষয়, একটি চুলও মাটিতে পড়ল না।’
প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু আরও বলেন, ‘বৌদ্ধ ধর্ম মতে, স্বর্গের ইন্দ্ররাজা এই চুলগুলো হীরা-মণিমানিক্যখচিত স্বর্ণপাত্রে ধারণ করেন। পরে এই চুলকে কেশধাতু হিসেবে স্থাপন করে তাবতিংস স্বর্গে একটি চৈত্য নির্মাণ করেন এবং এই চৈত্যের নাম রাখা হয় চুলামনি চৈত্য। সেই বিশ্বাস থেকে বৌদ্ধরা স্বর্গের সেই চুলামনি চৈত্যকে পূজা করার উদ্দেশ্যে আকাশে ফানুস বা আকাশপ্রদীপ উত্তোলন করেন।’
মূলত, আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে ফানুস উত্তোলনের যথার্থতা বেশি। তবে ওই সময় বৃষ্টিবাদল ও আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় প্রবারণা পূর্ণিমা বা আশ্বিনী পূর্ণিমার দিনে ফানুস ওড়ানো হয় বলে জানান প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু।
