আহমেদ জামিল
·
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ৯:০১ পূর্বাহ্ন
দইয়ের লালচে আভা তৈরিতে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক রঙের একটি উৎস সিঁদুরগাছ। গাছটির ফলের বীজের বাইরের আবরণ থেকে তৈরি করা হয় লালচে-কমলা রঞ্জক। খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি প্রসাধনী ও বস্ত্র রাঙানোর কাজেও ব্যবহৃত হয় এই রং। ইংরেজিতে ‘লিপস্টিক ট্রি’ নামে পরিচিত গাছটি বাংলাদেশে দইগোটা, রংগোটা, লটকনগোটা ও সিঁদুরগাছসহ বিভিন্ন নামে পরিচিত।
মৌলভীবাজার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় প্রাঙ্গণে রয়েছে এই গাছ। সম্প্রতি গাছটিতে ফুটেছে হালকা গোলাপি-সাদা ফুল। একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে লালচে ফল। কোনো ডালে ফুল, কোথাও কুঁড়ি, আবার অন্য ডালে রয়েছে পরিপক্ব ফল। ফলের গায়ে নরম কাঁটার মতো অংশ থাকায় দূর থেকে সেগুলোকে লোমশ দেখায়। ইংরেজিতে গাছটির নাম লিপস্টিক ট্রি।
তবে একেকজনের কাছে একেক রকম পরিচয় গাছটির। দইগোটা, লটকনগোটা, রংগোটা, সিঁদুরি বা সিন্দুর ফুল নামেও পরিচিত এটা। আবার কেউ কেউ এটাকে জাফরান ফুল নামেও চিনেন। তবে এটি জাফরান নয় বলে জানিয়েছে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ।
ফলের গায়ে অসংখ্য নরম কাঁটা থাকায় দূর থেকে সেগুলোকে লোমশ মনে হয়। একই ডালে কোথাও ফুল, কোথাও কুঁড়ি, আবার কোথাও পাকা ফল দেখা যায়।
মৌলভীবাজার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় প্রাঙ্গণে থাকা গাছটির গোড়ায় লাগানো নেমপ্লেটে নাম লেখা রয়েছে ‘বিরল প্রজাতি। সিন্দুর/লটকা গাছ’। এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘Bixa orellana’। আমেরিকা অঞ্চলের উদ্ভিদটি সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে স্প্যানিশদের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
এটি বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। সাধারণত চার থেকে পাঁচ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। শরৎ থেকে শীতের প্রথম ভাগ পর্যন্ত এর ফুল ফোটার প্রধান সময়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা জনাব মির্জা মেহেদী সরোয়ার বলেন, ‘এটি বিরল প্রজাতির সিঁদুর গাছ। এর ফুল সাধারণত গোলাপি বা সাদাটে গোলাপি। ফল কাঁটাযুক্ত লালচে রঙের। বীজের বাইরের আবরণ থেকে প্রাকৃতিক লালচে-কমলা রং তৈরি করা হয়। খাদ্য ও প্রসাধনীতে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় এই রং ব্যবহার করা হয়। শোভাবর্ধক উদ্ভিদ হিসেবেও গাছটি লাগানো হয়।
তিনি বলেন, ‘ন্যাচারাল ফুড কালার’ হিসেবে দইয়ে ব্যবহার করা হয়, এ জন্য এটিকে আঞ্চলিক ভাষায় ‘দইগোটা’ বলে। আমাদের কার্যালয়ে প্রায় ১০–১২ বছর ধরে গাছটি আছে। প্রায় প্রতিবছরই ফুল-ফল আসে।’
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডিন ও হর্টিকালচার বিভাগের প্রধান ড. মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, এটি মূলত একটি প্রাকৃতিক রঙের (Natural dye) উৎস। দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন স্থানে কাপড় বা সুতা রঙ করার কাজে এটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এটি কোনো ক্ষতিকারক বা বিষাক্ত উদ্ভিদ নয়
তিনি বলেন, গাছটিকে অনেকে ‘জাফরান’ বলে চালিয়ে দেওয়ার বা বিক্রি করার চেষ্টা করে, তবে এটি প্রকৃত জাফরান নয়। বাংলায় একে ‘রং দানা’ বলা হয়। এছাড়াও স্থানীয়ভাবে অনেকে একে ‘সিন্দুর’ বা ‘লটকা গাছ’ নামেও ডাকে। গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম ‘Bixa orellana’ (বিক্সা ওরেল্লানা), যা Bixaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।
সিলেট অঞ্চলে এই গাছ তুলনামূলক কম দেখা যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ করে বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে যাওয়ার পথে রাস্তার দুই পাশে এটি প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়। বাণিজ্যিকভাবে গাছটির চাষাবাদ না থাকায় এবং প্রাকৃতিকভাবে অযত্নে বেড়ে ওঠায় অনেকে একে ‘বিরল প্রজাতি’ হিসেবে আখ্যা দেন
ড. মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, বিরিয়ানি ও দইসহ অন্যান্য খাবারে প্রাকৃতিক রঙ হিসেবে ব্যবহারে সুনির্দিষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এটি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া যায় না। তবে খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ এটি নিয়ে কোনো গবেষণা করেছে কি না সেটা জানা দরকার।
গুগলে আমাদের খবর পেতে
