সিরিয়ায় ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে জর্ডান। দেশটির একটি গির্জায় বন্দুকধারীদের হামলায় অন্তত ৯ জন নিহত হওয়ার পর প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিবেশী দেশটিতে দফায় দফায় প্রাণঘাতী এই হামলা চালায় জর্ডানের সামরিক বাহিনী। হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, জর্ডানের হামলায় নিহতদের মধ্যে তিন শিশু ও এক নারী রয়েছেন বলে জানিয়েছে সিরীয় কর্তৃপক্ষ। হামলা চালানোর আগে জর্ডান তাদের সঙ্গে কোনো সমন্বয় করেনি বলেও জানিয়েছে দামেস্ক। এ ঘটনার পর দুই দেশের মধ্যে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের প্রধান ও একমাত্র সীমান্তপথও বন্ধ করে দিয়েছে সিরিয়া।
জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত শুক্রবার দেশটির কারাক প্রদেশের একটি গির্জায় বন্দুকধারীদের হামলার জবাবে দক্ষিণ-পূর্ব সিরিয়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ‘আস্তানায়’ হামলা চালানো হয়েছে। ওই হামলায় অন্তত ৯ জন নিহত এবং আরও বহু মানুষ আহত হয়েছেন।
জর্ডানের সামরিক বাহিনী বলেছে, সিরিয়ায় এই হামলা চালানো হয়েছে ‘সিরীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে’। তাদের দাবি, বিমান হামলায় ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বহু সদস্য নিহত ও আহত হয়েছেন এবং তাদের বেশ কয়েকটি যানবাহন ধ্বংস হয়েছে’।
তবে জর্ডানের সঙ্গে হামলার বিষয়ে কোনো সমন্বয়ের কথা অস্বীকার করেছে সিরিয়া। সিরীয় সরকার এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আগাম সমন্বয় বা অবহিত করা ছাড়াই সামরিক অভিযানটি পরিচালনা করা হয়েছে’। এ ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে বলেও জানিয়েছে দেশটি।
সিরিয়ার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, সোমবার (২৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় দেশটির দারা ও সুয়েইদা প্রদেশের গ্রামীণ এলাকায় অন্তত চারটি স্থানে হামলা চালানো হয়। পরে উদ্ধারকর্মীরা তিন পুরুষ, এক নারী ও তিন শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেন।
সংস্থাটি জানায়, নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের পাঁচ সদস্য রয়েছেন। দারা প্রদেশের আল-তাই গ্রামের একটি তাঁবুতে হামলায় ওই পরিবারের এক পুরুষ, এক নারী ও তিন শিশু নিহত হন। এ ঘটনায় পরিবারের আরও তিন সদস্য আহত হয়েছেন। আহদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে।
দ্বিতীয় হামলাটি হয় দারা প্রদেশের আল শাইয়া এলাকায়। এতে ৮০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিহত হন। তৃতীয় হামলাটি দারার আইন আল-বাসাল এলাকার মুজাইরিব শহরের একটি আবাসিক ভবনে চালানো হয়। এতে কেউ হতাহত হননি। চতুর্থ হামলাটি হয় সুয়েইদা প্রদেশের শাহবা শহরের একটি আবাসিক ভবনে। এতে ৬০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিহত হন।
এদিকে বিমান হামলার পর সিরিয়ার সীমান্ত কর্তৃপক্ষ নাসিব সীমান্ত পারাপারের পথ বন্ধ করে দেয়। এতে দুই দিকেই যান চলাচল স্থগিত হয়ে যায়। জর্ডান ও সিরিয়ার মধ্যে যাত্রী ও বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের একমাত্র সীমান্তপথ এটি।
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা এই হামলাকে ‘বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে হামলার পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করবে মন্ত্রণালয়।
এর আগে সোমবার জর্ডানের নিরাপত্তা বাহিনী গির্জায় হামলায় জড়িত থাকার সন্দেহে দুই ভাই ও তাদের ভগ্নিপতিকে গ্রেপ্তার করে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের পর আল-জাদিদা গ্রাম থেকে তাদের আটক করা হয়।
জর্ডানের সরকারি সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে, প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলা সংঘর্ষে সন্দেহভাজনরা গুরুতর আহত হন।
প্রসঙ্গত, গির্জায় হামলার পর জর্ডানের রাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ কঠোর জবাব দেয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। এর পরই সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার ও সিরিয়ায় বিমান হামলার ঘটনা ঘটল।
ওই হামলার সময় তিন বন্দুকধারী রাজধানী আম্মানের প্রায় ৯০ কিলোমিটার দক্ষিণে কারাকের একটি গ্রিক অর্থোডক্স গির্জায় শেষকৃত্যানুষ্ঠানে অংশ নেয়া লোকজনকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ বলেছিলেন, হামলার জন্য দায়ীদের ‘সবচেয়ে কঠোর শাস্তি’ দেয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনারও নির্দেশ দেন।
উল্লেখ্য, কারাক অঞ্চলে খ্রিস্টানদের একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে। জর্ডানের মোট ১ কোটি ১৫ লাখ মানুষের মধ্যে খ্রিস্টানদের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ।
খুলনা গেজেট/এএজে
