বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন বাজার ও জনবসতি এলাকার নদীতে নিয়মিত ফেলা হচ্ছে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেটসহ বিভিন্ন ধরনের অপচনশীল বর্জ্য। এতে নদীর পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি জলজ প্রাণী, মাছ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বর্জ্য জমতে থাকায় উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন বাজার ও নদীতীরবর্তী এলাকায় জনসচেতনতার অভাব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং যত্রতত্র ময়লা ফেলার কারণে নদীদূষণের আশঙ্কা বাড়ছে। বাজারের ব্যবসায়ী, ক্রেতা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যবহৃত প্লাস্টিকসামগ্রী অনেক সময় নির্ধারিত স্থানে না ফেলে নদী, খাল কিংবা নদীর তীরে ফেলা হয়। জোয়ার-ভাটার পানির সঙ্গে এসব বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ে নদী ও সুন্দরবনের গভীর অংশে।
প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি করে। প্রচলিত অধিকাংশ প্লাস্টিক সহজে পচে মাটির সঙ্গে মিশে যায় না। সময়ের সঙ্গে এগুলো ভেঙে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণায় পরিণত হতে পারে। এসব কণা মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর দেহে প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, পানির গুণগত মান কমে যাওয়া এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
সুন্দরবনসংলগ্ন নদীতে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানতে চাইলে পশ্চিম সুন্দরবনের বন সংরক্ষক শাহিনুর ইসলাম বলেন, সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার মতো জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ গাছপালা কার্বন ধারণ করে এবং ঢেউ ও ঝড়ের প্রভাব থেকে উপকূলকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করে। তাই সুন্দরবন এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত নদী-খালের পরিবেশ রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
প্লাস্টিক বর্জ্য নদীতে ফেলা জলবায়ু পরিবর্তনের একমাত্র বা প্রধান কারণ নয়। তবে প্লাস্টিকের উৎপাদন, ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পর্যায়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হতে পারে। অন্যদিকে, নদী ও বনাঞ্চলে বর্জ্য জমে থাকলে বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় এলাকায় এ ধরনের দূষণ পরিবেশগত সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাই সুন্দরবনসংলগ্ন নদীতে প্লাস্টিকজাতীয় বর্জ্য ফেলা বন্ধ করে বন ও নদী রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
সুন্দরবনসংলগ্ন নদী ও খালে অপচনশীল বর্জ্য ফেলার কারণে জীবিকা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইয়ুথ ফর বাংলাদেশের মুখ্য সংগঠক ইমাম হোসেন বলেন, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার বহু মানুষ মাছ ধরা, কাঁকড়া আহরণ, কৃষিকাজ ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন। নদী দূষিত হলে মাছ ও অন্যান্য জলজ সম্পদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে দূষিত পানি, দুর্গন্ধ ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বেসরকারি সংস্থা সিসিডিবির উপজেলা সমন্বয়কারী পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সুন্দরবনসংলগ্ন বাজারগুলোতে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি বাজার কমিটি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচার, নদীতীর পরিষ্কার অভিযান এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়মিত তদারকি চালু করা গেলে দূষণ কমানো সম্ভব। সুন্দরবন ও নদী রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকার পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্বশীল আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় পরিবেশসচেতন মহলের প্রত্যাশা, সুন্দরবনকে ঘিরে পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও প্রাকৃতিক সুরক্ষারও অন্যতম অবলম্বন। তাই নদীকে প্লাস্টিক বর্জ্যমুক্ত রাখা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
সুন্দরবনসংলগ্ন নদী ও বাজারগুলোকে প্লাস্টিক বর্জ্যমুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এমএ
