ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে আবারও বাস রুট পুনর্বিন্যাস ও কোম্পানিভিত্তিক পরিচালন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ১ নভেম্বর থেকে ছয়টি রুটে এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। লক্ষ্য, একই সড়কে একাধিক কোম্পানির বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করা, যানজট কমানো এবং যাত্রীদের নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল যাতায়াত নিশ্চিত করা। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় বাসের মালিকানা ও পরিচালনার কাঠামো বদলালেও যানবাহনের বড় অংশ থাকবে পুরোনো। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন কি বাস্তবে যাত্রীসেবার মান উন্নত করতে পারবে?
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছয়টি রুটে ৮১৬টি বাস পরিচালনা করা হবে। এসব বাসের বেশির ভাগই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণবিহীন। নতুন বাস কেনার পরিবর্তে বিদ্যমান যানবাহন মেরামত করে রঙ পরিবর্তনের মাধ্যমে সেবায় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নির্ধারিত বাসস্টপেজ, টিকিট কাউন্টার, ইলেকট্রনিক টিকিট এবং জিপিএসভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। তবে ঢাকায় বাসসেবার সংকট শুধু যানবাহনের বাহ্যিক চেহারা কিংবা কোম্পানির নাম পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, নির্ধারিত সময়সূচির অভাব, চালকদের মধ্যে যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতা, ভাড়ায় অনিয়ম, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং সড়কে বিশৃঙ্খলা দীর্ঘদিনের সমস্যা। এসবের কার্যকর সমাধান ছাড়া নতুন উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
৬৬ কোম্পানির বাস, কার্যকর রুট মাত্র ৯৮টি: ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে ৬৬টি কোম্পানির প্রায় ৭ হাজার ৫০০ বাস চলাচল করছে। অনুমোদিত ৪১৮টি রুটের বিপরীতে কার্যক্রম রয়েছে মাত্র ৯৮টি রুটে। একই পথে বিভিন্ন কোম্পানির বাস চলাচল করায় যাত্রী সংগ্রহ নিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে সড়কের নিরাপত্তা ও যান চলাচলের স্বাভাবিক গতির ওপর। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে বিদ্যমান ৯৮টি রুটকে পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি রুটে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে। নির্দিষ্ট রুটে নির্দিষ্ট কোম্পানির বাস চলবে। এতে বাসের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমবে, যাত্রী ওঠানামা নির্ধারিত স্থানে সীমিত রাখা সহজ হবে এবং পরিচালনায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ডিটিসিএ জানিয়েছে, যাত্রীদের যাতায়াতের ধরন বোঝার জন্য ১০ হাজারের বেশি বাসযাত্রীর ওপর জরিপ চালানো হয়েছে। পাশাপাশি ৩৫ হাজারের বেশি যাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত রুটের প্রায় ৭০ শতাংশ বর্তমান রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কিছু যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছাতে মাঝপথে বাস পরিবর্তন করতে হতে পারে। যাত্রীদের সুবিধা নিশ্চিত করতে এ পরিবর্তন কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে রুট নির্ধারণের পাশাপাশি বাস পরিবর্তনের স্থান, অপেক্ষার সময়, ভাড়া এবং সংযোগ ব্যবস্থার ওপর। শুধু রুটের সংখ্যা কমিয়ে দিলেই যাতায়াত সহজ হবে না। বরং যথাযথ পরিকল্পনা না থাকলে কিছু যাত্রীর ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
ছয় রুটে ৮১৬ বাস, বহরে নতুনত্ব কতটুকু?: প্রাথমিক পর্যায়ে ছয়টি রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিববাড়ী-গাজীপুর-মহাখালী-ঢাকেশ্বরী মন্দির রুটে ভিআইপি ও বিকাশ পরিবহনের সমন্বয়ে গঠিত কোম্পানির বাস চলবে। মিরপুর-কেরানীগঞ্জ রুটে দিশারী, তানজিল ও মেট্রোলিংক পরিবহনের সমন্বয়ে গঠিত কোম্পানি দায়িত্ব পালন করবে। ঘাটারচর-মোহাম্মদপুর-শাহবাগ-রামপুরা-ডেমরা রুটে চলবে রমজান আলী এন্টারপ্রাইজের বাস। ঘাটারচর থেকে শাহবাগ, পল্টন ও সাইনবোর্ড হয়ে কাঁচপুর পর্যন্ত ২৪ নম্বর রুট পরিচালনা করবে ফোর স্টার বাস লাইন। এ উদ্যোগে রাজনীগন্ধা, মালঞ্চ, সময় ও মিডলাইন পরিবহনও যুক্ত রয়েছে।
অন্য একটি রুটে ঘাটারচর থেকে মিরপুর-১০, আবদুল্লাহপুর হয়ে ধৌর পর্যন্ত পরিস্থান ও প্রজাপতি পরিবহনের সমন্বিত বাস চলবে। ষষ্ঠ রুটে টঙ্গী বিমানবন্দর থেকে এক্সপ্রেসওয়ে ও ফার্মগেট হয়ে আজিমপুর এবং ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মশিউর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, শুরুতে কয়েকটি কোম্পানির বাস সমন্বিতভাবে চললেও পরবর্তী সময়ে সেগুলোকে একক কোম্পানির অধীনে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
বাসগুলো একই ধরনের রঙে সাজানোর কাজও শুরু হয়েছে। তবে যানবাহনের বাহ্যিক সামঞ্জস্য এবং প্রকৃত মানোন্নয়ন এক বিষয় নয়। পুরোনো বাস মেরামত করে চালানো হলে সেগুলোর ইঞ্জিন, ব্রেক, দরজা, আসন, বায়ু চলাচল, ওঠানামার ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত ত্রুটি কতটা দূর করা হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শিশু ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য বাসে ওঠানামার সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ফিটনেসবিহীন বাস বাদ দেওয়ার কথা বলেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় কতটি বাস বাদ পড়বে, তার পরিবর্তে পর্যাপ্ত যানবাহন কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং নির্ধারিত বিরতিতে বাসের যান্ত্রিক সক্ষমতা পরীক্ষা করা হবে কি না, এসব বিষয়ে স্পষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা জরুরি।
পুরোনো উদ্যোগের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা কতটা?: ঢাকায় বাস রুট পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা নতুন নয়। ২০০৪ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় এ ধরনের সংস্কারের ধারণা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। পরে ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আনিসুল হক উদ্যোগটি সামনে আনেন। তার মৃত্যুর পর কার্যক্রমের গতি কমে যায়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ঘাটারচর-কাঁচপুর রুটে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা নগর পরিবহন চালু করা হয়। কিন্তু বাসমালিকদের বিরোধিতা এবং ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে উদ্যোগটি প্রত্যাশিতভাবে সম্প্রসারিত হয়নি।
২০২৫ সালেও গাবতলী-চাষাঢ়া রুটে সীমিত পরিসরে বাসসেবা চালুর চেষ্টা করা হয়। ২০২৬ সালের আগস্টে নারীদের জন্য চালু হওয়া বিআরটিসির ‘পিংক বাস’ সেবাতেও পরিচালনাগত সমস্যা দেখা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অভিজ্ঞতাগুলো দেখায়, পরিকল্পনা গ্রহণের চেয়ে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন। বাসমালিকদের সম্পৃক্ততা, চালক ও শ্রমিকদের আয়-রোজগারের নিশ্চয়তা, নির্ধারিত রুটে শৃঙ্খলা এবং নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা না থাকলে নতুন কাঠামোও পুরোনো সমস্যায় আটকে যেতে পারে।
ডিটিসিএর উপ-পরিবহন পরিকল্পনাবিদ ধ্রুব আলমের মতে, আগের উদ্যোগগুলোর একটি দুর্বলতা ছিল বাসমালিক সমিতিগুলোর সঙ্গে যথাযথ সমন্বয়ের অভাব। এবার মালিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু মালিকদের সঙ্গে সমঝোতা হলেই যাত্রীস্বার্থ নিশ্চিত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নির্ধারিত রুটে চলাচলের পাশাপাশি অনুমোদনহীন বাসের প্রবেশ বন্ধ করা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন সরিয়ে দেওয়া এবং আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এসব বিষয়ে শিথিলতা থাকলে কোম্পানিভিত্তিক ব্যবস্থার সুফল সীমিত হয়ে পড়বে।
ইলেকট্রনিক টিকিটই বড় পরীক্ষা: কোম্পানিভিত্তিক বাসসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো কার্যকর টিকিটব্যবস্থা। বর্তমানে যাত্রী সংগ্রহের প্রতিযোগিতার সঙ্গে চালক ও সহকারীদের কমিশনভিত্তিক আয়ের সম্পর্ক রয়েছে। বেশি যাত্রী তুলতে গিয়ে বাসের মধ্যে পাল্লা দেওয়া, হঠাৎ থামানো এবং অনিরাপদভাবে সড়কের মাঝখানে যাত্রী ওঠানামার মতো ঘটনা ঘটে। এ পরিস্থিতি বদলাতে চালক ও সহকারীদের কমিশনভিত্তিক পারিশ্রমিকের পরিবর্তে মাসিক বেতনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে যাত্রীসংখ্যার ওপর তাৎক্ষণিক আয়ের নির্ভরতা কমতে পারে। তবে বেতন কাঠামো, কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক এবং কর্মীদের অধিকার সম্পর্কে পরিষ্কার নীতিমালাও প্রয়োজন।
ডিটিসিএ সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত ৩২টি রুটের মধ্যে একটি ছাড়া অন্য রুটগুলোর বাসমালিকেরা এখনো ইলেকট্রনিক টিকিট ব্যবস্থায় সম্মতি দেননি। টিকিট কাউন্টার স্থাপন নিয়েও কর্তৃপক্ষকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এখানেই নতুন উদ্যোগের বড় চ্যালেঞ্জ। ইলেকট্রনিক টিকিট চালু না হলে ভাড়া আদায়ে স্বচ্ছতা, যাত্রীসংখ্যার সঠিক হিসাব এবং কোম্পানির আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষা কঠিন হবে। একই সঙ্গে যাত্রীরা নির্ধারিত ভাড়া দিচ্ছেন কি না, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় হচ্ছে কি না এবং যাত্রাপথ অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করা হচ্ছে কি না, তা তদারকির সুযোগও সীমিত থাকবে।
২০২২ সাল থেকে ডিজিটাল টিকিট ব্যবস্থা চালুর একাধিক চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু বাসমালিক ও চালকদের একাংশের অনীহা এবং তদারকির দুর্বলতার কারণে সেসব উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়। এবারও যদি টিকিট ব্যবস্থা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে নতুন কোম্পানি গঠন করেও পুরোনো পরিচালনাগত সমস্যার অবসান ঘটানো কঠিন হবে।
বাসস্টপেজ, ফুটপাত ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় জরুরি: নির্ধারিত বাসস্টপেজ ছাড়া সুশৃঙ্খল গণপরিবহন পরিচালনা সম্ভব নয়। কিন্তু আগের উদ্যোগের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বড় ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। ডিটিসিএর ২০২৪ সালের পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকা নগর পরিবহন ও বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের পরীক্ষামূলক আটটি রুটে প্রায় ৪০০টি নির্ধারিত বাসস্টপেজের মধ্যে ১৬৫টি বাস্তবায়িত হয়নি। নির্ধারিত স্টপেজ না থাকলে চালকেরা যাত্রীদের ইচ্ছামতো স্থানে ওঠানামার সুযোগ দেন। এতে পেছনের যানবাহনের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং সড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়ে। নতুন ব্যবস্থায় তাই স্টপেজ নির্মাণের পাশাপাশি সেগুলো দখলমুক্ত রাখা, যাত্রীদের নিরাপদে অপেক্ষার ব্যবস্থা করা এবং নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এ কাজে ডিটিসিএ, ঢাকা মহানগর পুলিশ, দুই সিটি করপোরেশন ও সড়কসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। সড়ক ও ফুটপাতের অবৈধ দখল সরানো এবং নির্ধারিত রুটে চলাচলকারী বাসের পথে প্রতিবন্ধকতা কমানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ অন্যান্য যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত ও আইনসম্মতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা না রেখে কোনো শ্রেণির যানবাহন সরিয়ে দিলে নিম্ন আয়ের যাত্রীদের ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে সড়ক ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তে নিরাপত্তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচলের প্রয়োজনও বিবেচনায় রাখা দরকার।
নতুন বাস ও মেট্রোরেলের সংযোগ পরিকল্পনা: কোম্পানিভিত্তিক বাসসেবার পাশাপাশি মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য ২৫টি বৃত্তাকার রুটে নতুন বাস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব রুটে সম্পূর্ণ নতুন বাস আনার কথা জানিয়েছে ডিটিসিএ। প্রতিটি বাসে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন যাত্রী চলাচল করতে পারবেন। প্রধান রুটগুলোর জন্য ১২ মিটার দৈর্ঘ্যের ৫২ আসনবিশিষ্ট বাস চালুর প্রস্তাবও রয়েছে। এ ছাড়া বিআরটিসির বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে এ ধরনের সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাস ও মেট্রোরেলের সময়সূচি, স্টেশনের সঙ্গে বাসস্টপেজের দূরত্ব, ভাড়া পরিশোধের সমন্বিত ব্যবস্থা এবং যাত্রীদের নিরাপদে স্থানান্তরের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা না হলে নতুন রুট চালু হলেও যাত্রীদের সময় ও খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে না। আধুনিক বাস চালুর পাশাপাশি পুরোনো বাসের মানোন্নয়নের জন্যও নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা দরকার। কোন রুটে কতটি নতুন বাস আসবে, কতটি পুরোনো বাস বাদ দেওয়া হবে এবং সব বাসে ন্যূনতম কী কী নিরাপত্তা ও যাত্রীসুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, সে বিষয়ে প্রকাশ্য কর্মপরিকল্পনা থাকলে জবাবদিহি বাড়বে।
যাত্রীসেবার মান যাচাই হবে বাস্তব ফলাফলে: বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর মতে, বিদ্যমান বাস শুধু রঙ করে নতুন সেবার নামে চালু করলে যাত্রীসেবার মানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। তার বক্তব্য, শুরু থেকেই নতুন বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। পরিকল্পনা প্রণয়নে যাত্রী প্রতিনিধিদের যথাযথভাবে যুক্ত করা হয়নি বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, আগের ফ্র্যাঞ্চাইজি উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হওয়ার পেছনে দুর্বল সমন্বয়, কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতি এবং নির্ধারিত বাসের পাশাপাশি অন্য বাস চলাচল অব্যাহত থাকা ভূমিকা রেখেছে। তার মতে, নির্ধারিত রুটে অন্য বাসের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বন্ধ করা গেলে নতুন উদ্যোগ সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। একই সঙ্গে সাশ্রয়ী ভাড়া, কার্যকর টিকিট ব্যবস্থা, নির্ধারিত স্টপেজ এবং আধুনিক বাস চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বাসচালকদের একাংশও মনে করছেন, একই রুটে একটি কোম্পানির বাস চললে যাত্রী সংগ্রহের প্রতিযোগিতা কমতে পারে। তবে নতুন ব্যবস্থায় তাদের আয় কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ফলে শ্রমিকদের স্বার্থ, মালিকদের ব্যবসায়িক বাস্তবতা এবং যাত্রীদের অধিকারকে সমন্বয় করে পরিচালনাবিধি তৈরি করা জরুরি। সবশেষে, ঢাকার বাসব্যবস্থার সংস্কারকে শুধু ছয়টি রুটে বাস চালুর কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি সফল করতে হলে নির্দিষ্ট সময়সূচি, মানসম্মত যানবাহন, নির্ধারিত স্টপেজ, ইলেকট্রনিক টিকিট, একক ব্যবস্থাপনা, চালকদের বেতনভিত্তিক কর্মপদ্ধতি এবং নিয়মিত তদারকি একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের সামনে এখন দুটি পথ। আগের উদ্যোগগুলোর মতো কিছুদিন কার্যক্রম চালিয়ে পরে স্থবির হয়ে পড়া, অথবা প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি পরিমাপ করে দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে সংস্কার এগিয়ে নেওয়া। ছয়টি রুটে বাস চালু হওয়াই সাফল্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়। যাত্রীর অপেক্ষার সময় কমছে কি না, ভাড়া আদায়ে স্বচ্ছতা আসছে কি না, দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলা কমছে কি না এবং বাসের মান উন্নত হচ্ছে কি না, এসব সূচকেই প্রকৃত সাফল্য বিচার করতে হবে। ঢাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের অপেক্ষায় রয়েছেন। নতুন উদ্যোগ সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে কি না, তার উত্তর মিলবে পরিকল্পনার ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ও যাত্রীদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায়।
বিআলো/অর্নব