চলমান গ্যাসের সংকট ও জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের প্রভাবে রাজশাহীতে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠের খড়ি ও গোবর ঘুঁটে বা নন্দার ব্যবহার বাড়ছে।
রাজশাহী ব্যুরো
চলমান গ্যাসের সংকট ও জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের প্রভাবে রাজশাহীতে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠের খড়ি ও গোবর ঘুঁটে বা নন্দার ব্যবহার বাড়ছে। নগরীর হোটেল-রেস্তোরাঁ, ঐতিহ্যবাহী কালাই রুটির দোকান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর সবখানেই বাড়ছে কাঠের খড়ির কদর। অন্যদিকে, রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলে রাস্তার দুই পাশে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে গোবর ঘুটে বা নন্দা। শহরের ব্যবসায়ীরা গ্রাম থেকে এসব নন্দা কিনে এনে বিক্রি করছেন বেশি দামে। সব মিলিয়ে খড়ি ও নন্দার ব্যবসায় জমে উঠেছে বেচাকেনা।
রাজশাহী নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা, আমচত্বর, কাটাখালী, দামকুড়া ও নওহাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে কাঠের খড়ির আড়ৎ। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, নগরীতে অর্ধশতাধিক খড়ির আড়ৎ রয়েছে। প্রতিটি আড়তে প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকার খড়ি বিক্রি হয়। সে হিসাবে নগরীতে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ টাকার খড়ি বিক্রি হচ্ছে। মাসের হিসাবে এ বেচাকেনার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় দেড় কোটি টাকা। তবে এটি ব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে করা আনুমানিক হিসাব।
এদিকে, রাজশাহীর পবা উপজেলার কর্ণহার গ্রামে গেলে চোখে পড়ে নন্দার স্তূপ। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি করে রাখা হয়েছে নন্দা। স্থানীয়দের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, শহরের ব্যবসায়ীরা গ্রাম থেকে প্রতি ১০০ পিস নন্দা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে কিনে নিয়ে যান। পরে সেগুলো বেশি দামে বিক্রি করেন। ফলে গ্রাম থেকে নগর দুই পর্যায়েই গড়ে উঠেছে নন্দার বেচাকেনার বাজার। নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার খড়ির আড়ৎদার আমজাদ হোসেন বলেন, তার আড়তে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ মণ খড়ি বিক্রি হয়। এতে দৈনিক বিক্রির পরিমাণ ১০ হাজার টাকার বেশি। তিনি বলেন, বর্তমানে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণে খড়ির ক্রেতা বেড়েছে। আগে যারা অন্য জ্বালানিতে রান্না করতেন, নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের এমন অনেকেই এখন খড়ি দিয়ে রান্না করছেন। নগরীর বালিয়াডাঙ্গা এলাকার খড়ির আড়ৎদার মাহবুবুল আলম বলেন, রাজশাহীর কালাই রুটির সুনাম দেশজুড়ে। এ কারণে কালাই রুটি তৈরির অন্যতম জ্বালানি কাঠের খড়ির চাহিদা সারা বছরই থাকে। তবে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে বর্তমানে খড়ির বেচাকেনা আরো বেড়েছে। তিনি জানান, মৃত আমগাছ ছাড়াও শিশু, মেহগনি, আকাশমনি ও ইউক্যালিপটাস গাছের কাঠের খড়ির চাহিদা রয়েছে। এসব কাঠ দিয়ে বিভিন্ন হোটেল ও কালাই রুটির দোকানে রান্না করা হয়। পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতারাও প্রয়োজন অনুযায়ী খড়ি কিনছেন। সব মিলিয়ে খড়ির ব্যবসায় ভালো বেচাকেনা হচ্ছে। রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী কালাই রুটির ব্যবসার সঙ্গে কাঠের খড়ির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। নগরীর কোর্ট ভবনের সামনে প্রায় ৮০ বছর বয়সী খাইরুন নেছা কালাই রুটি বিক্রি করেন। তার দোকানেও রান্নার প্রধান জ্বালানি কাঠের খড়ি। খাইরুন নেছা বলেন, “প্রতি মণ খড়ি ৬০০ টাকা দরে কিনে কালাই রুটি তৈরি করি। গ্যাসের চুলায় এই রুটি তৈরি করা যায় না, তাই বাধ্য হয়েই কাঠের খড়ি ব্যবহার করতে হয়।” তিনি আরো বলেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণে এখন অনেকে খড়ি দিয়ে রান্না করছেন। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, রাজশাহীতে কাঠের খড়ির চাহিদা আগে থেকেই থাকলেও জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের কারণে এর বাজার আরো বিস্তৃত হচ্ছে। একদিকে কালাই রুটির ঐতিহ্য ধরে রাখতে খড়ির ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এর চাহিদা বাড়ছে। সব মিলিয়ে গ্যাসের সংকট ও জ্বালানির বাড়তি ব্যয় রাজশাহীর খড়ি ও নন্দার ব্যবসায় নতুন গতি এনেছে। তবে বিকল্প জ্বালানির ওপর মানুষের এই নির্ভরতা কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করছে গ্যাসের সরবরাহ, জ্বালানির মূল্য এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর।
