খেলা ডেস্কঃ
আজ থেকে ঠিক ৯ বছর আগের এক সন্ধ্যা। লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটার তখন ফুটবলের সব মহাতারকায় ভরপুর। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, নেইমার আর সের্হিও রামোসের মতো নামগুলোতে মুখরিত সেই আঙিনা যেন ফুটবলের এক অভিজাত দুনিয়া হয়ে উঠেছিল।
সেই ভিড়ে হ্যারি কেইনও উপস্থিত ছিলেন বটে, তবে কিছুটা আড়ালে। তখনো বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ রাজমুকুট তাঁর নাগালে আসেনি। একটু দূর থেকে তারকাদের ভিড় দেখছিলেন তিনি; হয়তো মনের কোণে জমা হয়েছিল সামান্য দীর্ঘশ্বাসও। ২০১৭ সালের সেই ফিফা বেস্ট অ্যাওয়ার্ডের মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেইন কি ঘুণাক্ষরেও ভেবেছিলেন, একদিন ঠিক এই থিয়েটারেই তাঁর নিজের রাজ্যাভিষেক ঘটবে?
অবশেষে ৯ বছর পর সত্যি হলো সেই কল্পনাই।
লন্ডনের সেই একই ঐতিহাসিক প্যালাডিয়াম থিয়েটার। কেইনের জন্মস্থান লেইটনস্টন থেকে দূরত্ব মোটে ৯ মাইল। মঞ্চটিও এক, কিন্তু এবারের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। চারপাশে ললামিনে ইয়ামাল, কিলিয়ান এমবাপ্পে আর রদ্রির মতো বর্তমানের সেনসেশনরা উপস্থিত থাকলেও, আজকের রাতের সব আলো কেড়ে নেওয়া সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটির নাম হ্যারি কেইন।
৩৩ বছর বয়সী এই ইংলিশ স্ট্রাইকার আজ বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যালন ডি’অরের মুকুটধারী!
ফুটবলের গল্পগুলো মাঝেমধ্যে রূপকথাকেও হার মানায়। হ্যারি কেইনের চলার পথটাও ঠিক তেমনি এক জাদুকরি গল্পের মতো। তবে এই সাফল্যের রূপকথায় কোনো অলৌকিক জাদুর কাঠি ছোঁয়া ছিল না; এর পেছনে রয়েছে অবিরাম ঘাম ঝরানো পরিশ্রম, বহু প্রত্যাখ্যান আর দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাওয়ার এক রূপকথাময় ইতিহাস। অথচ এই ইতিহাসটার সূচনা বিন্দু মোটেও রাজকীয় ছিল না।
শৈশবে আর্সেনালের বয়সভিত্তিক দলে সুযোগ পেলেও তৎকালীন কোচদের চোখে তিনি ছিলেন কিছুটা ‘মোটাসোটা’, যাঁকে ঠিক মানানসই ‘অ্যাথলেটিক’ মনে হয়নি। এই এক আজব যুক্তিতে তাঁকে দল থেকে বাদ দিয়েছিল আর্সেনাল। কে জানত, সেদিন যাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, একদিন সেই ছেলেই ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মানের শিখরে আরোহণ করবেন!
পরবর্তী সময়ে টটেনহাম হটস্পারের সঙ্গে দীর্ঘ ১৯ বছরের এক সুদীর্ঘ পথচলা। ক্লাবটির হয়ে একের পর এক গোল করেছেন, নতুন সব রেকর্ড গড়েছেন। কিন্তু কেইনের ঝুলিতে ট্রফি? সেটা যেন তাঁর ফুটবলজীবনে এক নিষিদ্ধ অধ্যায় হয়ে রইল।
টটেনহামে কাটানো দিনগুলোতে তাঁকে কতবারই না শুনতে হয়েছে ‘লুজার! লুজার!’ এর মতো নির্মম কটূক্তি। ফুটবল বিশ্ব বড় স্বার্থপর ও নিষ্ঠুর; এখানে গোল করলে নায়ক বানানো হয়, আর ট্রফি জিততে না পারলে সব অর্জনকেই ব্যর্থতা হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স যতই চোখধাঁধানো হোক না কেন, চূড়ান্ত সাফল্যের হিসেবটা সবসময় লেখা হয় ট্রফির সংখ্যা দিয়ে।
অবশেষে ২০২৩ সালে এসে এক কঠিন ও বড় সিদ্ধান্ত নিলেন কেইন। ইংল্যান্ডের মাটিতে অন্য কোনো ক্লাবের জার্সিতে না খেলার পণ করে, কেবল ট্রফি জয়ের অদম্য তাগিদে জন্মভূমি ছেড়ে পাড়ি জমান জার্মানিতে—বায়ার্ন মিউনিখে।
এরপরের তিন বছর ধরে তিনি শুধু রেকর্ড আর রেকর্ডই গড়েছেন। গত মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখ ও ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে ৬৪ ম্যাচে করেছেন ৭৩ গোল। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের ইতিহাসে এক মৌসুমে তাঁর চেয়ে বেশি গোল করার অনন্য রেকর্ডটি কেবলই লিওনেল মেসির দখলে আছে।
অবশেষে কেইনের জীবনের চাকা ঘুরে গেছে। আর সেই অনুকূল বাতাসের টানেই চিরতরে ভেসে গেছে পুরোনো দিনের সেই গ্লানিময় ‘লুজার’ তকমা। আজ তিনি গর্বিত ব্যালন ডি’অরজয়ী। কেটে গেছে ইংল্যান্ডের দীর্ঘ ২৫ বছরের আক্ষেপ ও অপেক্ষার প্রহর।
২০০১ সালে মাইকেল ওয়েনের পর প্রথম কোনো ইংরেজ ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অর জয় করলেন কেইন। ওয়েন যখন এই পুরস্কারটি জিতেছিলেন, কেইন তখন আট বছরের এক ছোট্ট শিশু। আর্সেনালের বয়সভিত্তিক দলে ফুটবল খেলায় হাতেখড়ি হওয়ার দিনগুলোও তখন অনেক দূরে।
সবমিলিয়ে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে পঞ্চম ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অর অর্জনের গৌরব অর্জন করলেন কেইন। স্যার স্ট্যানলি ম্যাথুস, ববি চার্লটন, কেভিন কিগান ও মাইকেল ওয়েনের বর্ণাঢ্য নামের পাশে এখন চিরতরে খোদাই হয়ে গেল তাঁর নামও। ব্যালন ডি’অরের লালগালিচায় অনুষ্ঠান শুরুর ঠিক আগমুহূর্তেও সঞ্চালকরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছিলেন, ‘কেইন যদি আজ জিতে যায়, তবে তো তাঁকে স্যার হ্যারি কেইন বলতে হবে!’
কে জানে, হয়তো অদূর ভবিষ্যতে তাঁর নামের আগে সত্যিই ‘স্যার’ উপাধি যুক্ত হবে। তবে আনুষ্ঠানিক কোনো নাইটহুডের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হলেও, ইংল্যান্ডের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে কেইন ইতোমধ্যেই সেই সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করে নিয়েছেন। অথচ মানুষটা কী অপূর্ব এক ব্যক্তিত্বের অধিকারী, কী ভীষণ বিনয়ী!
লালগালিচায় এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার শেষে অনুষ্ঠানের এক উপস্থাপক মুগ্ধ হয়ে বললেন, ‘হ্যারি কেইন সত্যি একজন দারুণ ভদ্রলোক।’ তাঁর পাশে হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিখ্যাত ইতালিয়ান সাংবাদিক ফ্যাব্রিজিও রোমানোও তখন সায় দিয়ে মাথা নাড়লেন। পুরস্কার হাতে পাওয়ার পরও সেই চিরচেনা বিনয়ী কেইনকেই দেখতে পেলেন সবাই।
ব্রাজিলীয় কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও যখন বিজয়ী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করলেন, তখন কেইনের সামনে সোনালী ট্রফি, আর চারপাশে বিশ্বের তাবড় তাবড় মহাতারকারা। সঙ্গে আছেন তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ট বন্ধুরা। এমন পরম রোমাঞ্চকর মুহূর্তে অনেকেই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন, কেউবা নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে শুরু করেন, কিংবা সমালোচকদের কড়া জবাব দেন। কিন্তু কেইন করলেন ঠিক তার উল্টোটা।
তিনি সবার আগে গভীর কৃতজ্ঞতা জানালেন টটেনহাম ক্লাবটির প্রতি। যে ক্লাবে খেলে ট্রফি না পাওয়ার জন্য তাঁকে কম ব্যঙ্গবাণ সহ্য করতে হয়নি, সেই পুরোনো ঠিকানাকে তিনি একটুও ভুলে যাননি। খেলোয়াড়ি জীবনে এ পর্যন্ত যত কোচের অধীনে খেলেছেন, সবার নাম ধরে ধরে ধন্যবাদ জানালেন। ফরাসি কিংবদন্তি ও অনুষ্ঠানের সঞ্চালক থিয়েরি অঁরি তখন তাঁর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘তিনি হলেন পরিশ্রম ও সহজাত প্রতিভার এক নিখুঁত ও অপূর্ব সংমিশ্রণ।’
কেইনের কণ্ঠে তখন আবেগ ও বিনয়ের এক অপূর্ব সুর, ‘অনেকেই হয়তো এটা কল্পনাও করেননি। এমনকি আমিও কোনোদিন ভাবিনি যে আমি এত দূর পথ পাড়ি দিতে পারব। আমার ক্যারিয়ারের শুরুটা বেশ কণ্টকাকীর্ণ ছিল, অনেক চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে আমাকে এগোতে হয়েছে। আজকের এই কক্ষে উপস্থিত অনেকের মতো ছোট থেকেই সুপারস্টার হয়ে ওঠার মতো মানুষ আমি কখনোই ছিলাম না।’
একটু থেমে নিজের জীবনের সারসংক্ষেপ যেন নিজেই তুলে ধরলেন, ‘এখানে পৌঁছাতে সময় লেগেছে, অনেক হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হয়েছে। অনেক সময় এমন হয়েছে যে নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয়েছিল, তবুও নিজের ভেতরের বিশ্বাসটা আমি কোনোমতে ছাড়িনি।’
কথাগুলো বলতে গিয়ে পরিবার ও শৈশবের বন্ধুদের কথা মনে পড়ে তাঁর গলা কিছুটা ভারী হয়ে এসেছিল। তবে দ্রুতই নিজেকে সামলে নিলেন। দুই পা শক্ত করে মাটিতেই রাখলেন। ভোটদাতা, ভক্ত, প্রতিদ্বন্দ্বী সতীর্থ—কাউকে ধন্যবাদ জানাতে ভুললেন না তিনি। কিছুটা থেমেই সেই স্বভাবসুলভ ভদ্রতার সুরে বললেন, ‘এই মিলনায়তনে এমন কিছু বিশ্বমানের খেলোয়াড় উপস্থিত আছেন, যাদের তুলনা মেলা ভার। আজকের মনোনয়নপ্রাপ্ত ও বিজয়ী সব বন্ধুকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন।’
তবে কেইনের জয়ের এই সোনালী রাতটি কেবল একা ইংল্যান্ডের ছিল না। এই পুরো সন্ধ্যায় যেন স্পেনও প্যালাডিয়াম থিয়েটারে নিজেদের একচ্ছত্র রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে গেল।
এবারের আয়োজনে কেবল একা আটটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতে নিয়েছে স্প্যানিশরা। মেয়েদের ব্যালন ডি’অর জিতেছেন তারকা ফুটবলার অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস। এটি তাঁর ক্যারিয়ারের তৃতীয় ব্যালন ডি’অর জয়। এর মাধ্যমে আইতানা বোনমাতির টানা সর্বোচ্চ তিনবার এই পুরস্কার জেতার রেকর্ডে সফলভাবে ভাগ বসালেন পুতেয়াস। মেয়েদের বিভাগে ব্যালন ডি’অর টানা ষষ্ঠবারের মতো গেল স্পেনের ঝুলিতে। দেখে মনে হচ্ছে, পুরস্কারটির সঙ্গে যেন স্প্যানিশদের এক চিরস্থায়ী চুক্তি হয়ে গেছে!
অন্যদিকে, সেরা উদীয়মান তরুণ খেলোয়াড়ের ক্যাটাগরিতে টানা তৃতীয়বারের মতো ট্রফি জিতে নিলেন লামিনে ইয়ামাল। তবে তাঁর হাতে এই তরুণ উদীয়মানের ট্রফি দেখে অনেকের মনেই হয়তো প্রশ্ন জেগেছিল—তরুণ তুর্কি কি তবে মূল পুরস্কারটি হাতছাড়া করলেন বলেই আবার এই সান্ত্বনার ট্রফিতেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো? শেষ পর্যন্ত দৃশ্যপট সেটাই বলে দিল।
এদিকে স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে যখন ছেলেদের সেরা কোচের পুরস্কার গ্রহণ করতে মঞ্চে উঠলেন, তখন উপস্থিত দর্শকদের তুমুল করতালিতে পুরো থিয়েটার কেঁপে উঠল। দেখে মনে হচ্ছিল, কোনো রূপালি পর্দার হার্টথ্রব নায়ক বুঝি মঞ্চে পা রেখেছেন! বিশ্বকাপ জয়ের পর তাঁর অসামান্য জনপ্রিয়তা যে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, সেটি সেদিন দারুণভাবে স্পষ্ট হয়েছে।
ছেলেদের বর্ষসেরা ক্লাবের সম্মান জিতেছে পিএসজি। ক্লাবটির প্রতিনিধি হিসেবে পুরস্কার গ্রহণ করেন উসমান দেম্বেলে।
তবে সে রাতের সবচেয়ে আবেগঘন ও মন ছুঁয়ে যাওয়া মুহূর্তটি উপহার দিয়েছেন বুকায়ো সাকা। মানবহিতকর ও সমাজকল্যাণমূলক কাজে অসামান্য অবদানের জন্য মর্যাদাপূর্ণ সক্রেটিস ট্রফি দেওয়া হয় ইংল্যান্ডের এই কৃতি ফুটবলারকে। মঞ্চে উঠে তিনি সকলের সামনে রুয়ান্ডার চৌদ্দ বছর বয়সের এক ছোট্ট শিশুর পাঠানো মর্মস্পর্শী একটি চিঠি পড়ে শোনান। শিশুটির স্বপ্ন সে একদিন বড় হয়ে ইংরেজির শিক্ষক হবে, অথচ সে তার চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলার চরম ঝুঁকিতে ছিল। পরবর্তীতে একটি দাতব্য সংস্থার সাথে হাত মিলিয়ে সেই শিশুটির দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনতে বড় ধরনের সাহায্য করেছিলেন সাকা। ফুটবল যে কেবলই গোল, ট্রফি কিংবা কোটি টাকার বাণিজ্যের খেলা নয়, সেই মুহূর্তে সেটাই যেন সবাইকে নতুন করে মনে করিয়ে দিলেন তিনি।
এবারের আয়োজিত ব্যালন ডি’অরের আরও একটি বিশেষ তাৎপর্য ছিল। কারণ এটি ছিল এই সম্মানজনক পুরস্কারটির বর্ণিল ৭০ বছর পূর্তির সুবর্ণজয়ন্তী। ১৯৫৬ সালে ইতিহাসের প্রথম ব্যালন ডি’অর জয় করেছিলেন ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি স্ট্যানলি ম্যাথুস। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের অমূল্য সব স্থিরচিত্র ও ভিডিও ক্লিপ যখন পর্দায় ভেসে ওঠে, তখন পুরো পরিবেশটাই যেন অন্যরকম এক নস্টালজিয়ায় ভরে যায়।
তখনো কেইন ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে, ঠিক একটু পরেই এই ৭০ বছরের সুদীর্ঘ ইতিহাসের সর্বশেষ ও স্বর্ণালী অধ্যায়ে তাঁর নিজের নামটিই চিরতরে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হতে চলেছে।
এ জাতীয় আরো খবর..
